Wednesday, 25 December 2024

বড়দিনের মেটামরফোসিস

 

আজকালকার বড়দিনের মেটামরফোসিসে, সান্তা আছে, পান্তাও আছে, পাবলিক সবজান্তাও আছে।

প্লাষ্টিক-ফুল-শিরসজ্জিতা এঞ্জেল থিকথিক।

যদুবাবুর বাজারে ইস্পেশাল ট্রাফি-কেক।

সুমন-অঞ্জন এক ছাদের তলায়। একজন একে। অন্য দোতলায়।

মোমোর গন্ধে ম-ম এক্সাইড।

ফুচকা আর এগরোল যথারীতি ফুড বিলবোর্ডের তালিকার টপে।

আলু আর ডিম হলো বাংলার "আপনি থাকছেন স্যার" রজতাভ দত্ত। সবেতেই আছেন।

আঙ্গুল উঁচিয়ে "ট্রাফিক রুল, তুমি ভুল" বলে সদর্পে লালবাতিতেই এগিয়ে যায় হাতে হাত ধরা সদ্য প্রেমে পড়া ম্যাংগো-জনতা।

সাউথ কলকাতা চকমক।

বাস নেই, ট্যাক্সি নেই।

মেট্রো বাঙালি-ওষুধ-বাক্সের চেয়েও ওভারলোডেড।

ওলা-উবের ধনকুবের।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই স্মাইলিং। কেউ দুঃখী নেই এ তল্লাটে। একমাত্র আবশ্যিক হলো কেক, অন্য সবকিছু চূড়ান্ত ফেক। সবকিছুই। কিছুদিন আগে অব্দি বড়দিন বলতে চিড়িয়াখানা, একাডেমি, জাদুঘর, নিকোপার্ক ছিল। লম্বা লাইন দেখা যেত দূরদূরান্ত থেকে। এখন পার্কস্ট্রিট আর বো-ব্যারাক্স । দুর্গাপুজোর মতো দলে দলে সবাই চলে। কিসের দিকে  এগোচ্ছে কেউ জানে না । হয়ত কিছু বছর পরে প্যান্ডেল হবে। যীশু-সান্টা মঞ্চে বসবেন। প্যান্ডেলের থিম হবে। উৎসব ২৫ থেকে ৩১ অব্দি চলবে।  মন্দ কী! মানুষ নতুন নতুন জামা পড়বে, ছবি তুলবে , সবাইকে দ্যাখাবে। কেউ কারোরটা দেখবে না। সব সবাই নিজের জন্যই করে যাবে। একটা ঘোরের মধ্যে জীবন কাটবে। নো সমস্যা, নো ক্রিয়েটিভিটি, নো বুদ্ধিমত্তা , নো প্রশ্ন। 

পূর্ণিমার চাঁদটা বড়ো ভালো, সাথে সাথে থাকে।



(২৬ ডিসেম্বর ২০১৮)





Monday, 23 December 2024

মাদুলি নয়, মাজুলি

 রসিকবাবু বলেন, শীতকালে যাওয়া উচিত মাজুলি।

মাদুলি নয়, মাজুলি।
সকালবেলা আড়মোড়া ভাঙেন যে দিকে মুখ ঘুড়িয়ে, হ্যা হ্যা ঠিক ওই দিকে।
অনলি থাউসেন্ড কিলোমিটারস ফ্রম কোলকাত্তা।
পৃথিবীর বৃহত্তম নদী দ্বীপটি যে একেবারেই আপনার পড়শি তা কি জানতেন? মিসিং উপজাতিদের খ্রীষ্টমাস সেলেব্রেশন দেখেছেন কখনো?
অবশ্য শুধুই যে সেই জন্যই রসিকবাবু মাজুলি জপ করেন, তা নয়।
রসিকবাবু বিয়ের পর যে বার প্রথম গিন্নীকে নিয়ে মাজুলি গেছিলেন, সে বছর গিন্নীকে মিসিংদের বানানো মুখোশ কিনে দিতে, গিন্নী খুশিতে লাফিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন রসিকবাবুকে।
ওরকম এক বাজার লোকের সামনে শুধু গোঁফওয়ালা অনিল কাপুরকেই জড়িয়ে দেখতে দেখা যায়, ওই বত্রিশ ইঞ্চি স্ক্রিনে।
এরকম একটা ঘটনা রসিকবাবুর সাথেই যে ঘটে যাবে, তা তো কখনো ভাবেননি। প্রথমে হঠাৎ একটু ভেবলে গেলেও, ঠিক সামলেছেন। শুধু ঘটনার আচম্বিকতাতে শারুখ খানের মতো ডানা মেলতে ভুলে গেছিলেন। তাই ডানা মেলার প্রাকটিস চালিয়ে যান বাথরুমে। আর প্রতিবছর ঢুঁ মারেন গিন্নীর সাথে, মাজুলিতে, মুখোশ হাতে।
তাই শীতকালেই, হ্যা ওই শীতকালেই মাজুলি যেতে সাজেস্ট করেন রসিকবাবু।
মুখোশটা কিন্তু মাস্ট।





Wednesday, 4 December 2024

ভুলের পর ভুল করে যাচ্ছ

 একটা পাখি উড়তে উড়তে বলে গেলো, "ভুলের পর ভুল করে যাচ্ছ।"

একটা শিরশিরে দমকা হাওয়া হঠাৎ ঘুরে ফিসফিস করল, "উহু, অন্যায়।"

একমুঠো রোদ চমকে উঠে বলল, "কি করে সহ্য করছ?"

এক মেঘ তার বৃষ্টিকে বুকে আগলে বলতে বোল্ট চলে গেলো, "দমবন্ধ লাগে না তোমাদের? আমাদের লাগে"

ধূসর গাছগুলো ক্লান্ত হয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলছে,"হাহ"। 

একটা সবুজ পাতা খুশি খুশি মুখে পৃথিবীকে প্রথম দেখবে বলে মুখ বাড়াতেই আশেপাশের বয়স্ক পাতারা ভয় পেল। বলল,"লুকিয়ে পর, লুকিয়ে পর।"

লম্বা লম্বা নির্মাণগুলি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। "হমম" 

এক মনকেমনকরা চাঁদের আলো বলল, "ভালো আছো? ভালো থেকো।"


আমি অবাক হয়ে বললাম, "এরকম কেন বলছ? কি হয়েছে তোমাদের?"


ওরা একসাথে চিৎকার করে বলে উঠল, "মনুষ্যত্ব মশাইকে দেখতে পাচ্ছি না বহুদিন। উনি বাড়ি আছেন?"


(০৫ -ডিসেম্বর-২০১৭)



Tuesday, 3 December 2024

মেয়েটি কি কাঁদছিলো?

 বাচ্চা মেয়ে। কি সুন্দর পোজে ঠমকি চমকি!

"কলসি কাঁখে চলছি মৃদু চালে" পায়ে নূপুর ধিনাক না তিন তালে।
একটু ভালো করে দেখলে তার গায়ের ময়লা চোখে পড়ে কি? আরো ভালো করে দেখলে ওর নাক থেকে ঝরা জল?
মেয়েটি কি কাঁদছিলো?
আচ্ছা ওকে মেয়ে বলা যায়? নাকি ও এখনো শিশু? যার নিজের কোলে চড়ার বয়স, সে কলসি বয়ে চলেছে!
ছবিতে তো আর সব ধরা পড়ে না। ভালো করে দেখলেও কতটাই বা জানা যায়, বোঝা যায়।
কত গল্প অজানা থেকে যায়, যা জানলে ছবির সাথে দূরত্ব লক্ষ ক্রোশ বেড়ে যায়।
আমি এই ছবিটার নাম দিয়েছি "জীবন" কারণ এতে হাসি আর কান্না দুটোই (আন) ফেয়ারলি ব্যালান্সড।
(04-Dec-2020)

(Pic from Internet)



Monday, 18 November 2024

মেয়েরা শুধুই "টাফ গাই" গায়

 আমার এক পুরুষ বন্ধু। কষ্ট পেলে সে কেঁদে ফেলে। কি ভীষণ অবাক কান্ড! ছোটবেলা থেকে আশপাশের লোকজনের ধারাবাহিক ঠাট্টার চাপে আজকাল চোখ  কিঞ্চিৎ ছলছল হয়, যা কিছু পরেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তার ধারণা সে এবার বোধহয় যথেষ্ট "পুরুষ" হয়েছে। 

আমার এক দাদার শপিং না করলে মাস পূরণ হয় না। লোকজন তাকে "বাতিকগ্রস্ত" বলে। বলে, "মেয়েদের মত স্বভাব"।

আমার এক মেসো টিকটিকি দেখলেই লাফায়। মাসীর পিছনে লুকিয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা মেসোকে আড়ালে "মেয়েছেলে" বলে। মাসিকে কেন যে "ব্যাটাছেলে" বলে না, তা বুঝি না!

আমার এক পরিচিত পুরুষ তার বৌ প্রেগনেন্ট হওয়ার পরেই চাকরি ছেড়ে হাউস-হাসব্যান্ড হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্বেচ্ছায়। বৌ নিশ্চিন্তে চাকরি করে। আত্মীয়স্বজন শুরুতে খামখেয়ালি করছে ভেবেছিল। বেশ কিছুদিন যেতে ঘটনার গাম্ভীর্য্য বুঝে তারা একশো কুড়ি কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে বাড়ি এসে বা ফোন করে মনোবিদ-গিরি করেছিলেন, পরিস্থিতির অস্বাভাবিকত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই। কোনও হেলদোল হয়নি দেখে গালাগালি করে তবে বাড়ি ফিরেছেন। 

আমার দেখা কিছু পুরুষ গোলাপি রং পছন্দ করে। কী লজ্জা! 

আমার দেখা কিছু পুরুষের ভয়ানক মুড সুইং হয় থেকে থেকে। অযৌক্তিক আর্গুমেন্টের কাঞ্চনজঙ্ঘা তৈরী হয়। কী ভয়ঙ্কর!

অনেক পুরুষই কখনও পছন্দের মানুষের কাছে নিজেকে সর্বস্ব ছেড়ে দিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে চেয়েছে আর চেয়েছে যাতে সেই মুহূর্তে কেউ মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিক। কী ন্যাকা!

আর এসবের পর যদি সামনে আসে "গে" পুরুষ, তাহলে তো আর...  যাক-গে। 

কথা হচ্ছে, উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট আজকাল মার্কেটে যতটা অনুকূল, পুরুষদের ওভার-এমপাওয়ারমেন্ট ততটাই সংকুল। রণে বনে জলে জঙ্গলে এমনকি স্বপ্নেও পুরুষের "পুরুষ" হয়ে থাকার অহোরাত্র নাটক করে যেতে হচ্ছে। মারাত্মক!

আমাদের মতো দেশে যেখানে ছোটবেলা থেকেই পুরুষদের শেখানো হয় তুমি একটা টাকা তৈরীর মেশিন। অনেক টাকা রোজগার করতে হবে, গাড়ি কিনতে হবে, সবাইকে "দেখাতে" হবে। নিদেনপক্ষে ভবিষ্যতে একটা গার্লফ্রেন্ড বা বৌ জোটানোর জন্যও টাকা রোজগার করতে হবে। তোমাকে শেখানো হয়, একবার টাকা রোজগার করলে তুমি হবে রাজা। 

যদি দেখাতেই হয় শুধু রাগ দেখাও। তুমি রানা প্রতাপ হবে। 

গৌতম হবে, গম্ভীর হবে, বুদ্ধ হতে যেও না। 

তোমার কাঁদলে চলবে না। ডিপ্রেশন আবার কী! 

টাট্টু ঘোড়া হয়ে শুধু ছুটতে হবে। মেয়েরা শুধুই "টাফ গাই" গায় এবং চায়। 

গার্লফ্রেন্ড না থাকলে অথবা এখনও ভার্জিন থাকলে তোমার মুখে কচুপাতা ঢেকে চলা উচিত। 

মায়ের আর বৌয়ের ওয়েইট স্কেল মেশিনের ব্যালান্স তুমি। 

এসবের মধ্যেও তুমি চলছো। ব্যালান্স করছো। কখনো লুকিয়ে কেঁদে, কখনো স্লিপিং পিল খেয়ে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে  ..... 

কিন্তু ইকোসিস্টেমের তুমি অর্ধাংশ। তুমি yin yang এর অর্ধ্যেক। তুমি অর্ধনারীশ্বরের আংশিক। তোমাকে ছেড়ে তো কিছুই নয়। 

কাঁদতে পারো তুমি, তুমি কোমল হতে পারো, ডিপ্রেশন স্বাভাবিক হতে পারে, কন্সালটেন্সি নিচ্ছো বলে হাসছে যারা তারা অশিক্ষিত, ভার্জিনিটি একটা অপসন ঠিক যেমন বিয়ে অথবা সন্তান। 

"ইমোশন" জেন্ডার স্পেসিফিক নয় গো।


#happyinternationalmensday #InternationalMensDay




Monday, 4 November 2024

শান্তিগোপাল

- রুটিই যদি বানাবেন ভাবছেন, পরোটাই হোক।

-পরোটা যদি হচ্ছেই, একটু ডিম ভেজে চেপ্টে দিন।

-এসব ভাজা ব্যালেন্স করতে veggies হয়ে যাক, পিয়াজ, ক্যাপ্সি, লঙ্কা।

-এসব যখন হলোই, একটু লেবু বুলিয়ে দিলেন নাহয়।

-এবার মুড়ে দিলেই হলো।

- এ কে রে শান্তিগোপাল

- বলছি ফ্রিজে বাসি চিকেন কি একেবারেই নেই!

- মরণ দশা

















ভারতীয় আর বাঙালি আলাদা

 ঠিক এইসময়টাতে ভারতীয় আর বাঙালি আলাদা।

দেশের বাইরে সবাই যখন বাঙালিকে প্রশ্ন করছে, আর ইউ নট সেলিব্রেটিং দিওয়ালি? কি করে বোঝাই, মশাই, উই ডোন্ট হ্যাভ দিওয়ালি। ছোটবেলায় দীপাবলিও তেমন জানতাম না। কালীপুজো এটাই। বাজি ফাটবে। ভয় হতো। তারাবাতি আর সাপবাজি ফাটাতে সাহস পেতাম। চকোলেটের মতো সুস্বাদু বস্তু কালীপুজোয় হঠাৎ বোমা হয়ে মহা ত্রাস তৈরী করতো। কালীপটকা নিয়ে নাজেহাল ছিল কুকুর শ্রেণী। তুবড়ি প্রতিযোগিতা হতো। দেখতে বেশ লাগতো। কার তুবড়ি কত উঁচু। পাড়ায় শাঁখ বাজানোর প্রতিযোগিতাও হতো। কখনও বুক কাঁপিয়ে দিতো। কখনও হাসি ছুটিয়ে দিতো। তবে এসবের পরেও একটা চিন্তা দুদিন পরেই স্কুল খুলবে আর খুললেই পরীক্ষা। অর্থাৎ কালীপুজো মানেই ছুটি শেষ।  

"হ্যাপ্পি দিওয়ালি"র ঢাই কিলো-কা হাতের ভয়ে সেই সব দীপাবলি, প্রদীপ-মোমবাতিকে বগলদাবা করে কেটে পড়ার তালে। টুনির মা বাজার মাতিয়ে ফেলেছে মশাই।

আর এসেছে ঝাঁটা। কেন! কেউ জানে না। কিন্তু সবার বাড়িতে ঝেঁটিয়ে ঝাঁটা। 

ভূত চতুর্দশী কাকে বলে? ঘরে ঘরে এখন হালোইন ইন। শিশুরা এখন বাজি নয়, কুমড়ো নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করছে। ছয় বছরের রিয়া বাবাকে বাজার থেকে কুমড়ো আনতে বলছে। বাবা হা। দিদিমা গদ গদ। বৌমা মেয়েকে এখন থেকেই রান্না শেখাচ্ছে বুঝি, আহা! রিয়া বলে উঠলো, মা ছুরিতে ধার আছে তো? ভূতের দাঁত বানাতে হবে। দিদিমা জল খেলেন।

তবে বাজির ব্যাপারটা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে (হয়তো)! ছোটবেলার চকোলেট বোমা, কালী পটকা, দোদোমা, দিদিমা, কাকিমা, মাসিমা, এই মা, ওই মা যে কত দাদুর হার্টএটাক ঘটিয়েছে, কত কাকু যে সাময়িক বধিরত্ব পেয়েছিলেন, কত কুকুরের যে ল্যাজ পুড়েছিল, কতদিন যে সে আতঙ্কে ডাস্টবিনের পিছনে লুকিয়েছিল, তার ইয়ত্তা নেই। সেসব, বাজি বাজার থেকে যে আপাতদৃষ্টিতে বেপাত্তা, তাতে আমি বেশ খুশি। লুকিয়ে যারা আজও ডিমান্ড এবং সাপ্লাই এ অংশ নিচ্ছেন, তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় শীঘ্রই হোক, এই প্রার্থনা করি।

যাই হোক, দীপাবলি শুভ কাটুক।

(26 October 2019)