Friday, 2 February 2024

ও ঠাকুরমশাই! আমার বাড়িতে ছোট্ট করে .. প্লিস .. বাচ্চাটা অনেকক্ষণ ধরে ..

 -ও ঠাকুরমশাই বলছি মানে ইয়ে একটু পুজোটা দিয়ে যান না।

-কেন বৌদি, কাল যে দেখলুম রাঘব ভটচাজের সাথে ডিল করলেন, লম্বা ফর্দ করলেন উনি. আসেননি বুঝি? জানতুম চিরকাল ওর প্রচন্ড লোভ, অ্যাডভান্স করে বসেননি তো আবার হে হে

-ইয়ে মানে, ওই এক শো.... সে বাদ দিন, বলছি বাচ্চা মেয়েটা আশা করে আছে, অঞ্জলি দেবে। আপনি একটু করে দিন না।

-আহা রে, আসলে আমি তো খেয়ে ফেলেছি, মানে আগের বাড়ি এতো জোড় করলো, আমার আবার লোভ কম। অনলি ছ-বাড়ি পুজো আর ছ-নম্বরে একটু লুচি, পায়েস, সুজি  ....

-তাতে কি! একটু এদিক-ওদিক করে ম্যানেজ করে নিন না প্লিজ।

-হে হে, সব কি আর ওভাবে ম্যানেজ হয় বৌদিমনি, ওই যে বললুম লোভ আমার এক্কেবারে নেই। ওসব পাপের কাজ করবো নাকি, খেয়ে পুজো?

- আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ, কোনো পাপ নেই, আপনি ভগবানের ডিরেক্ট প্রতিনিধি বলে কথা, আমি আসলে একটা শাড়িও কিনে রেখেছি, আর ধুতি-মিষ্টি-পোলাও-বেগুনভাজা তো আছেই। ভেবেছিলাম ব্রাহ্মণকে দান করবো।

- ওহ! ইয়ে  ... পোলাও-বেগুনভাজা  ...  ইয়ে শুধুমাত্র বাচ্চাটার মুক চেয়ে রাজি হলুম, চলুন দেখি, সব জোগাড় যন্তর দেখিয়ে দিন


সিঙ্গারা সেসময়

স্কুলে এক মাসি ছিলেন, টিফিনের সময়ে ঝুড়ি নিয়ে আসতেন। ঝুড়িতে থাকত সিঙ্গারা। দু টাকাতে পাওয়া যেত একটা সিঙ্গারা। ঝুড়ির পাশে আরেকটা মিনি ঝুড়ি থাকত, পয়সা ফেলার জায়গা। দুপুরে ঘন্টা বাজলেই, মাসি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে থাকত। বাকি সমস্ত কাজ অটোমেশনে হত। ছাত্রীরা আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে মাসির কাছে পৌঁছত, পয়সা ফেলত এক হাতে, সিঙ্গারা নিত অন্য হাতে এবং গায়েব। পুরো ব্যাপারটা একেবারে সাজানো।
বাড়িতে প্রতি শনিবার বিকেলে গরম-পাতলা-মচমচে-চামড়া-ভরাট-পুর সিঙ্গারা নিয়ে আসত কাকা। রবিবার নিয়ে আসত বাবা। বিকেল পাঁচটায় দূরদর্শনে উত্তমকুমারের (বেশিরভাগ সময়) সিনেমা চলত। উত্তম-সিঙ্গারায় সময়টা জব্বর কাটত।
রবিবার সকালে আঁকার স্কুল থেকে মাঝে মাঝে সিঙ্গারা খাওয়া হত। তার আকার অপেক্ষাকৃত ছোট, দামে কম কিন্তু স্বাদ চমৎকার।
অষ্টমীর অঞ্জলি শেষ করে কচুরি খাওয়াই নিয়ম তবে সিঙ্গারা হলেও মন পুলকিত হত সন্দেহ নেই।
বিয়ের সম্বন্ধ দেখতে গেলে (আজকের দিনে প্রায় অস্তিত্বহীন), ছোটদের যাওয়ার তেমন প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও, নিয়ে যাওয়া হত সঙ্গে। তাই গিয়েছিলাম। সেখানে মিষ্টির পাহাড়ের মাঝে সিঙ্গারার পাহাড় না থাকলে বিষয়টা জমত না!
শীতকালের ফুলকপির সিঙ্গারার মহিমা ছিল অন্যরকম। ছোটরা গপাগপ খেয়ে যখন ঢেঁকুর তুলছে, জেঠু পুরের দিকে ভালো করে দেখে বুঝছেন, ফুলকপির পরিমাণ আগের থেকে কমছে কি!
সিঙ্গারার সঙ্গে পার্টনার হল জিলিপি। সিঙ্গারার নোনতা-ঝালের মাঝে মাঝে জিভকে চমকে দিয়ে মিষ্টির আস্বাদ, এ এক বিস্ময়কর পার্টনারশিপ। পরের দিকে চাটনি/সস দেওয়া শুরু হল বটে, তবে ব্যক্তিগতভাবে ওসব অনুষঙ্গ ছাড়া মূল বিষয়ের স্বাদ নেওয়ার আনন্দ নিতে পছন্দ করেছি।
পৃথিবীর প্রায় ৪০টি দেশে ঘুরেও সিঙ্গারার মহিমা বাংলার বাইরে কোথাও পাইনি টেবিল চাপড়ে বলতে চাই। মনে রাখতে হবে, সিঙ্গারা আর সামোসা এক নয়। এক করলে, তা সমস্যা।

শিশুকালের অগুণতি সিঙ্গারা গ্রাস করার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে কমেছে। শিশুকালের সেই দুনিয়া এখনকার তেল, দূষণ, বুকজ্বালা, এন্টাসিড, ওবেসিটির দুনিয়ার থেকে অনেক দূরের।

Wednesday, 17 January 2024

প্রথম গ্রীক মহিলা ডাক্তার, চিকিত্সক এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (Agnodice)

 প্রাচীন গ্রীসে তখন, নারীদের মেডিসিন প্র্যাক্টিস করা নিষিদ্ধ ছিল। 300 খ্রিস্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণকারী, অ্যাগনোডিস তার চুল কেটে আলেকজান্দ্রিয়া মেডিকেল স্কুলে একজন পুরুষের পোশাকে প্রবেশ করেছিলেন। এবং এভাবেই ডাক্তারি শিক্ষা শেষ করে একদিন এথেন্সের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনি প্রসবকালীন এক মহিলার কান্না শুনতে পান। অ্যাগনোডিস মহিলাকে সাহায্য করতে গেলে, মহিলাটি রাজি হননি, তিনি ভেবেছিলেন, অ্যাগনোডিস একজন পুরুষ। অ্যাগনোডিস প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি একজন মহিলা এবং মহিলাটিকে প্রসব করতে সাহায্য করেছিলেন। এই গল্প চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সমস্ত মহিলা Agnodice এর কাছে যেতে শুরু করেন। এদিকে পুরুষ চিকিত্সকরা অ্যাগনোডিসকে অভিযুক্ত করেছিলেন, তারা ভেবেছিলেন পুরুষ অ্যাগনোডিস মহিলা রোগীদের প্রলুব্ধ করে তাদের চিকিৎসা করছে। অ্যাগনোডিস, আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি একজন মহিলা কিন্তু এবার, ডাক্তারি পড়া এবং একজন মহিলা হিসাবে অনুশীলন করার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চারিদিকে বিপ্লব শুরু হয়, প্রতিবাদে একজোট হন নারীরা, এমনকি বিচারকদের স্ত্রীরাও। কেউ কেউ বলেছিলেন যে যদি অ্যাগনোডিসকে হত্যা করা হয় তবে তারাও তার সাথে মৃত্যু বরণ করবেন। শেষে চাপ সহ্য করতে না পেরে বিচারকরা অ্যাগনোডিসের সাজা তুলে নিতে বাধ্য হন। এরপর থেকে গ্রীসে নারীরা ওষুধ অনুশীলন করার অনুমতি পান তবে শুধুমাত্র মহিলাদের চিকিত্সা করতে। এইভাবে, Agnodice প্রথম গ্রীক মহিলা ডাক্তার, চিকিত্সক এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে ইতিহাসে তার চিহ্ন তৈরি করেছিলেন। অ্যাগনোডিসকে চিত্রিত করা এই ফলকটি ইতালির ওস্টিয়াতে খনন করা হয়েছিল, যা এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। কখনও কখনও আমরা ভুলে যাই যে আমরা যে সুযোগ-সুবিধাগুলি উপভোগ করি তা কত কষ্টের, কত লড়াইয়ের ফল। ছোট বড় কত কিছু যা আজ "taken for granted", একসময় তা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত ও স্বীকৃত। প্রণাম সেই প্রথম আগুনকে।




Tuesday, 8 December 2020

নিশিকান্তর ভালোবাসা

 নিশিকান্ত ভালোবাসতে ভালোবাসে। অথচ প্রথম প্রেমে দড়াম ধাক্কা খেয়েছিল। প্রেমের কটা বছর কেটেছিল প্রতিমুহূর্তে ভালোবাসার মানুষকে ভেবে ভেবে। প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর সেই ভাবনাগুলোই ক্যাকটাসের তীক্ষ্ণ স্পাইনের মত বিঁধেছিল। দুটো পর্যায়ই গভীর। দুর্ভাগ্য নিশিকান্ত-এর মধ্যে আবেগের ভলিউম সাধারণের থেকে বেশি। বন্ধু, গান, বই, কাজ, পরিবার, রাস্তা, গাছ, আকাশ, দুর্গাপুজো, রবিবার, মদ, গাঁজা এত্ত কিছু তার জীবনে থাকলেও শুধু ওই প্রেম-প্রেম ব্যাপারটাই নিশিকান্তর জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন, তা কেউ বোঝে না! কাউকে ভালোবাসা আর কেউ তাকে ভালোবাসে এইটুকুর প্রত্যয়ই তো তার চাওয়া। এখন সোশ্যাল মিডিয়া আছে। তার মাধ্যমে বন্ধু পাওয়া একেবারে ঢেঁকুর তোলার মতো সহজ। কিন্তু এখন নিশিকান্ত একটু বড়ো হয়েছে। ছোট্টবেলার প্রেমটা তার যেমন তেমন কিভাবে যেন হয়ে গিয়েছিলো। এবার তো সে সচেতন। নিজের একটা চেকলিস্ট বানিয়েছে সে। সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষজনকে নিশিকান্তর ভীষণ shallow মনে হয়। গভীরতা নেই। সবটাই রঙ চঙে মলাট। সবাই সব জানে। অথচ আঙ্গুল ডোবে না। নিশিকান্তর আরো বেশ কয়েকটা সমস্যা আছে, সে নিজের বয়সের ছেলেমেয়ের চেয়ে মানসিকভাবে একটু বেশিই বড়। নিজের গায়ের রং আর কাজকর্মের পরিধি নিয়ে হীনমন্যতা আছে। তার নিজের গুণ মানুষের কাছে বাড়িয়ে না বলে বরং লুকোনোর মহান গুণ আছে। সৎ হয়ে থাকার আর ভালোমানুষ হওয়ার বাতিক আছে। অর্থাৎ আজকের টিকে থাকার রেসে কোনোটাই এক্সেপটেবল ক্রাইটেরিয়া নয়। অতএব সঠিক মানুষের খোঁজ নিশিকান্ত পায় না। এভাবে দশ বছর কাটে। পাব, বালিগঞ্জ স্টেশন, গাঁজার ঠেক, মানসিক ডাক্তার, ওষুধ আর চায়ের দোকান ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাচ্ছে। নিশিকান্ত সব ছেড়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করবে ভাবছে সচেতন ভাবে। 

আর যখন চারিদিক বন্ধ, ছোট্ট পুঁচকে আলো এলো নিশিকান্তএর সোশ্যাল মিডিয়ার ফ্রেন্ড লিস্টে। যত আলাপ বাড়ে নিশিকান্তর মনে হয়, যেন এর জন্যই তার অপেক্ষা। চেকলিস্ট মাইল যাচ্ছে ম্যাজিকের মতো। সিনেমা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন। এরকম হয়না বাস্তবে। কিন্তু স্বপ্নটাই আরো বেশিক্ষণ দেখবে বলে নিশিকান্ত ডুব দেয় স্বপ্নসিন্ধুতে। এরপরের দিনগুলো একেবারে দুর্গাপুজোর মতো। পেটে প্রজাপতি, ইমোশনের চড়াই উৎরাই, রাগ-অভিমানের নাগরদোলা কি নেই। ধীরে ধীরে নিশিকান্ত সেই একেবারে হারিয়ে ফেলা প্রত্যয় খুঁজে পায় নিজের মধ্যে। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে নিশিকান্তর এখন খুব। জীবনটাকে এইবার যেন জীবন বলে মনে হচ্ছে নিশিকান্তর। এতদিন যেন শীতঘুমে ছিল। এভাবেই মধুযামিনী চললো এক্সপ্রেসওয়েতে একশো কুড়ি কিলোমিটার বেগে। সবকিছুর মত সেসব কাটতেই নতুন সমস্যা তৈরী হলো। নতুন মানুষের সাথে চাওয়া পাওয়ার সমস্যা। দুজনেই প্রত্যাশা ভালোবাসা, কিন্তু চাহিদা দুজনেরই, একই সময়ে, অনেকটা। কেউ একটু পিছু হটে আরেকজনকে সুযোগ দিতে চায় না। ভালোবাসাটুকুই তো চাই। তাতে আপোষ কেন! যুক্তির আইসবার্গ তৈরী হয়ে পোক্ত। সহজে তা গলে না। শেষে কান্নাকাটি, ভাঙ্গাভাঙ্গি। নিশিকান্ত ভালোবাসা চেয়েছিল। কিন্তু মৌলিক পদার্থ নিয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শুধুই পেটে প্রজাপতি ভালোবাসা নয়। ধৈর্য্য, সময়, আপোষ, নিয়ন্ত্রণ, অনু পরমাণু এসব যে এতো গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝেনি নিশিকান্ত। এখন নিশিকান্তর সব আছে। কিন্তু শান্তি? স্থিরতা? হারমোনি?  



Wednesday, 13 May 2020

এনিমেটর

সার্গে মস্কোভিচ এই কিছুবছরে কার্টুন এনিমেশনে কাজ করে হলিউডে ভারী ওজনের নাম করে ফেলেছেন। তাঁকে এনিমেটর হিসেবে পেলে সিনেমার কমার্শিয়াল বেনিফিট নিয়ে নিশ্চয়করণই হয়ে যায়। শুধু মানুষ নয়, গাড়ি, বাড়ি, মোবাইল, গাছ এমনকি রান্নার বাসনকেও কার্টুন বানিয়ে দর্শকের চিত্ত বিনোদন করেছেন সার্গে। সকলে ওনাকে ট্র্যাজিক এনিমেটর বলে। কারণ তাঁর গল্পের শেষে চমক থাকে। ট্র্যাজিক বুক হিম করা চমক, যার ইমপ্যাক্ট দর্শকের ওপর থাকে অনেকক্ষন।
বহুদিন পর সার্গে আবার হিউমান কার্টুন নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। শুরুতেই স্কেচগুলো রেডি। গল্পের লাইন আপের সাথে আপাতত ফিট। এবার স্প্লিনিং এর কাজ শুরু। প্রেমের গল্প। মাঝে খানিক অ্যাকশন। ট্র্যাজিক এন্ডিং - মেয়েটি ছেলেটিকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য দেশে। সবকটা লেয়ার শেষ করতে বহুদিন লাগলো। গতরাতেই শেষ লেয়ারে কাজ করেছেন। আজ ঘুম থেকে উঠতে সার্গের অনেক দেরি হলো। এরকম দেরি হলে অবশ্য সার্গের দিব্বি লাগে। কফি খেতে খেতে অনিয়মের দুপুর পেরোয়। বিকেলে বসলেন স্মুথিংয়ের কাজ করতে। শেষ লেয়ারগুলোতে হঠাৎই চোখ পড়লো। এরকম ঝকঝকে রং ছিল না বলেই মনে পড়ে সার্গের। বিদায়বেলা মানেই সমবের টাচ, হালকা নীল। কিন্তু এতো লাল রং। এরকম ভুল তো সার্গের হওয়ার কথা নয়। তা যদি হয়ও, ছেলেটি খিলখিলিয়ে হাসছে? কি করে সম্ভব। কালই তো ছেলেটির ফেস এক্সপ্রেশনের ইম্পেরফেকশন কারেকশন করলেন সার্গে। ছেলেটির থাকবে স্যাড এক্সপ্রেশন। তার বদলে হাসি! প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ফোন করলেন সালভাদরকে। বন্ধু, সহকর্মী, প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটি মানুষ। ঠিক এই সময় যাকে ভীষণ প্রয়োজন সার্গের। বন্ধু শুনে বললেন, গাঁজা ছাড়া এরকম দুঃসাহসিক কান্ড করানোর ক্ষমতা আর কারোর নেই। কথা বলে সার্গের মনটা ঠিক হলো সামান্য। কিন্তু গাঁজা খেয়ে মাউসে হাত দিয়ে ক্লাইম্যাক্স দিয়েছেন সার্গে এর আগে বহুবার। শুধুমাত্র গাঁজার পরাক্রমে এতো ভুল, স্বাভাবিক লাগছে না সার্গের। তবে বয়সের আক্রমণ ভেবে সার্গে ব্যাপারটাকে আপাত অগ্রাহ্য করে কাজে মন দিলেন। ফাইনাল সেভিংএর সময় ভালো করে দেখে একটা নোট রাখলেন "রেভিউড"।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙলো সার্গের। জল খেতে উঠলেন। চোখ পড়লো কম্পিউটারে। স্ক্রিন অন। অফ করেই শুতে গিয়েছিলেন সার্গে। এতো ভুল একসাথে হতে পারেনা। লেয়ারগুলোতে চোখ বোলাতেই হবে। আবার কিছু পিকুলিয়ার  ..... না আপাতত ঠিকই আছে। একদম শেষে এসে আবার ...... ড্যাম। আবার শেষের লেয়ারগুলোতে ঝকঝকে রং। ছেলেটা? হ্যা, আবার সেই হাসি মুখ। এইতো রেভিউয়েড নোট ওয়ালা ফাইল। এরপরেও এই রং, এতো পার্থক্য! ভুল নয়। ভুল নয়। কোথাও কিছু সমস্যা হচ্ছে। কিছু হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে আবার কখন সার্গে ছবি কারেক্ট করতে শুরু করলেন নিজের অজান্তেই। কিন্তু সব গুলিয়ে যাচ্ছে। নাহ ঠিক করলেন কাল সকালে দেখবেন। সেরকম কিছু গন্ডগোল হলে সালভাদরকে ডেকে নেবেন না হয়। ঘুম হলো না। তন্দ্রা ছিল। সূর্যের আলোর অপেক্ষা ছিল। অনেক শক্তি নিয়ে ফাইল খুলতেই আবার সেই। এবার যেন পাগল হয়ে যাবেন সার্গে। ইনসেন। টেকনিক্যালি সব নিখুঁত। কিন্তু গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঘেটে যাচ্ছে যে।     
লেয়ার গুলো খুঁটিয়ে দেখছেন সার্গে। সব ঠিকই রয়েছে। ঠিক শেষ দৃশ্যে যখন মেয়েটির চলে যাওয়ার কথা, সেখানে সে দৌড়ে আসছে, ফিরছে। ঝকঝকে রং চারিদিকে। আলোয় আলো। ছেলেটি হাসছে। চোখে মুখে ভাস্করতার প্রভা। কিভাবে এসব হচ্ছে! কার্টুন ক্যারেক্টার নিজেরাই কন্ট্রোল করছে! ও কি সম্ভব! এরকম হলে চলে না। পাবলিক দুঃখ গেলে। মার্কেটে সেটাই চলে। এ জিনিস কেউ দেখবে না। সার্গে হঠাৎ অসহায় বোধ করছেন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোলেন টানা ০৩ দিন। শেষে এই ফাইলটাই দিয়ে দিলেন প্রোডাক্শনকে। গল্পের সাথে মেলেনি এরকম একটি কাজ দিলে প্রোডাক্শনের কাছ থেকে যে হেনস্তা হতে হবে তা মেনে নেওয়ার শক্তি নেই সার্গের। যেখানে নিজের বিচার বুদ্ধির ওপরেই জোর নেই। নিজের হাতের ওপরেই ভরসা নেই। যা হচ্ছে, তার কোনো যুক্তি নেই। সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন না সার্গে। উধাও হয়ে গেলেন হঠাৎ। লোকে বলে মেক্সিকোর কোনো গ্রামে আছেন। বাচ্চাদের অ্যানিমেশন সেখান। খুশির অ্যানিমেশন। হাসির।
ওনার শেষ কাজ যার এন্ড ট্রাজিক, তা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলো। ওনার থেকে ট্রাজিক এন্ডিং এক্সপেক্ট করে দর্শক যখন হ্যাপি এন্ডিং দেখলো, চমকটা সেইখানেই হয়ে গিয়েছিলো।
ওই এনিমেশনের শেষে লেখা ছিল, সার্গে, টি এন্ড অফ ট্রাজেডি। 

Friday, 27 March 2020

তাইজিতু

দেখলাম এক বন্ধুস্ত্রী হাতে একটি ট্যাটু করিয়েছেন। একটি প্রতীকী। জিজ্ঞেস করাতে একটু খাবি খেলেন। বললেন, ও ওই ওই আর কি, ওই মানে ব্যাপারটা কুল, তাই আর কি  ......
তা "কুল"র টেস্ট সবসময়ই ভালো। সরস্বতী পুজোর পর তা একটু বরং বেশি। তাই টেস্ট করতে একটু খোঁজাখুঁজি করেই ওই "কুল" প্রতীকীটির ব্যাপারে জানা গেলো।
কাকতালীয় ব্যাপার মশাই, আজ যখন চীনে ব্যাপার নিয়ে সারা পৃথিবী বেশ সরগরম, প্রতীকটিও চিনে। চীনা ঐতিহ্যবাহী ‘তাইজিতু’ (Taijitu) প্রতীক (ছবি সাঁটানো)। এই প্রতীকের একপাশ অন্ধকার বা কালো (ইন), অন্য পাশ আলোকিত বা সাদা (ইয়াং)।
"ইন" আর "ইয়াং" এর কথা নিয়ে কোটি লেখা থিক থিক করছে ই-জগতে। ছোট করে বলতে গেলে, চাইনিস "টাও" ফিলোসফি মতে,  ইন মানে মুন, ইয়াং মানে সান। ইন মানে ঢাকা, ইয়াং মানে খোলা। ইন মানে মহিলা, ইয়াং মানে পুরুষ। আর উভয় মিলেই এই ইউনিভার্স। একে অপরকে ছাড়া কিছুই নয়। খুবই জানা তথ্য। নতুন কিছু নয়। অর্ধনারীশ্বর কনসেপ্ট তো আমাদের ঘরের। এ নিয়ে সবাই আমরা সুজ্ঞানী। কেউ বলতে বললেই চার নম্বরের সারাংশ নেমে যাবে চোখের পলকে। হোঁচট খেলাম যখন আরও পড়ছি আর বুঝছি চাইনিস মত অনুযায়ী ইন মানে নেগেটিভ, আর ইয়াং মানে পসিটিভ। ইন মানে প্যাসিভ, অন্ধকার, কালো আর ইয়াং মানে একটিভ, আলো মানে সওওওওওব ভালো। ইউনিভার্সের সাদা কালো, অন্ধকার আলোর কন্সেপ্টে মহিলাদের ওই অন্ধকারের সাথে যোগে আমার বড় ধাঁধা।মহিলাদের নেগেটিভ বলে যে মহান কান্ড চাইনিস এনসেস্টররা করেছেন, আজকের চাইনিসরা তার প্রতিবাদ করেন যদিও। তারা জেন্ডার ইকুয়ালিটিতে বিশ্বাস করেন। তথাপি মধ্যযুগীয় কাল থেকে মহিলাদের এই যে নঞর্থক ভাবার প্রবণতা তা অন্য দেশেও স্পষ্ট। ১৪ থেকে ১৮ শতকে মহিলাদের দ্বারা কোনো ব্যাভিচারের অভিযোগ আসলে, শাস্তি হিসেবে আবিষ্কার হয়েছিল এক যন্ত্র যাকে "ব্রেস্ট রিপার" বলে (ছবি সাঁটানো)। এই যন্ত্র দিয়ে তাদের ব্রেস্ট ছিড়ে নেওয়া হতো। নানা এক্সপেরিমেন্ট এও দেখা গেছে, সুযোগ পেলে শান্ত নিরীহ পুরুষও মহিলাদের শরীরের সুযোগ নিয়েছেন। শেক্সপীয়ারের গল্প অনুযায়ী,  শ্রীউ বলে অবিহিত করা হতো স্পষ্টভাষী মহিলাদের, যাদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক চোখে দেখা হতো। এথেন্সে ডেমোক্রেসি শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, তবু মহিলাদের মা হিসেবে দেখাই অর্থাৎ সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং তাদের লালন করাই একমাত্র কাজ বলে মনে করা হতো। ঋগ্বেদ যুগ বাদ দিলে ভারতবর্ষে মহিলাদের ইনইকুইলিটিও সবারই জানা।
যদিও আজ চিত্র অন্য। তার জন্য পুরুষদের সুচেতনাকে ধন্যবাদ।

কিন্তু কথা হলো, বন্ধুস্ত্রী, যিনি এই প্রতীকটিকে বহন করে চলেছেন, তাকে নিয়ে আমার বড়ো দুশ্চিন্তা। কুল দেখাতে গিয়ে মস্ত ভুল করেননি তো?





Tuesday, 18 February 2020

ডেথ ড্রাইভ

ধরে আছে? নাকি ছেড়ে দিতে চাইছে?
এসব ভাববো না কল করবো পুলিশ? ইমিডিয়েট হেল্প?
বেশ কিছু লোকও ততক্ষনে জড়ো হয়েছে আসে পাশে। সবাই হা করে ওপরে তাকিয়ে। সবার মুখে ভয় আতঙ্ক। এদিক ওদিক দেখছেন। কেউ কি কল করেছে অলরেডি পুলিশে? হেল্প কি আসছে? কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, হেই। আর ইউ ক্রেজি? হোল্ড অন। ডোন্ট ডোন্ট ডোন্ট ডু দিস ম্যান। একজন বয়স্ক মহিলা বিড়বিড় করছেন। বোধহয় ঈশ্বরকে ডাকছেন।
হঠাৎ একজন হেসে উঠলো। সাথে সাথে একটা চাপা হিসহিস, ফিসফিস। আর ছোঁয়াচে হাসি একটু একটু করে সবাইকে কব্জা করলো। আরে ফাইবারগ্লাসের একটা স্ট্যাচু যে।
আজ্ঞে। চেকরিপাব্লিকের প্রাগ শহরের স্টেয়ার মেস্তো অর্থাৎ ওল্ড টাউনে এই স্ট্যাচুটি আসলে ট্যুরিস্টদের জন্য একটা চমক।
----------------------------------------------------------------------------------------------
সিগমান্ড ফ্রেউড ছিলেন একজন সাইকোএনালিস্ট। সাইকোএনালিসিস্ শব্দটির জন্মদাতা এই ব্যক্তি নানা চিকিত্সাবিদ্যাগত আবিষ্কার করেছেন মানুষের সাইকিক নেচারের নানা ক্ষেত্রে যেমন বিষাদ, ইগো, স্বপ্ন এমনকি থানাটোস অর্থাৎ মৃত্যুর চালক ইত্যাদিতে। নিউরোলজিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রায় আশি বছর বয়সে তিনি যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে, তখন তাঁর খ্যাতি এবং জন্মসূত্রে ইহুদি সংযোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মানসিক-শারীরিক অত্যাচার সহ্য করেন। তাঁর নিজের লেখা মূল্যবান তথ্য পুড়িয়ে দেওয়া হয় চোখের সামনে। নিরুপায় হয়েই পালিয়ে যেতে হয় লন্ডনে। শেষের সে দিন তখন ভয়ঙ্কর রিফুজি অবস্থায় কাটছে যখন, ধরা পড়লো ক্যান্সার বীজ শরীরে জাঁকিয়ে বসেছে। সমস্তটা জীবনে নানা মানুষের আতঙ্ক, সাবকন্সসিয়াস মানসিক অবস্থা নিয়ে এনালাইসিস করা ব্যক্তি নিজেও ভয় পেয়েছেন বহুবার নিজেকে নিয়ে। আতঙ্কে থেকেছেন। মনে হয়েছে জীবনকে ধরে রাখবেন নাকি হাল ছেড়ে দেবেন। শেষে যখন অসুস্থতা চরমে, খাওয়া বন্ধ হলো, কথা বলাও, নিজের মৃত্যুর ভয়ে প্রতিদিন মরছিলেন পলে পলে। সিদ্ধান্ত নিলেন মরফিনের হাই ডোসে মৃত্যুবরণ করবেন তাঁর ডাক্তার বন্ধুর সাহায্যে। হলোও তাই। প্ল্যান মাফিক কাজ।

প্রাগের মূর্তিটি তাঁর ওই মানসিক অবস্থাকে উৎসর্গ করেই, ধরে রাখবেন নাকি জাস্ট ছেড়ে দেবেন!