Showing posts with label life. Show all posts
Showing posts with label life. Show all posts

Wednesday, 13 May 2020

এনিমেটর

সার্গে মস্কোভিচ এই কিছুবছরে কার্টুন এনিমেশনে কাজ করে হলিউডে ভারী ওজনের নাম করে ফেলেছেন। তাঁকে এনিমেটর হিসেবে পেলে সিনেমার কমার্শিয়াল বেনিফিট নিয়ে নিশ্চয়করণই হয়ে যায়। শুধু মানুষ নয়, গাড়ি, বাড়ি, মোবাইল, গাছ এমনকি রান্নার বাসনকেও কার্টুন বানিয়ে দর্শকের চিত্ত বিনোদন করেছেন সার্গে। সকলে ওনাকে ট্র্যাজিক এনিমেটর বলে। কারণ তাঁর গল্পের শেষে চমক থাকে। ট্র্যাজিক বুক হিম করা চমক, যার ইমপ্যাক্ট দর্শকের ওপর থাকে অনেকক্ষন।
বহুদিন পর সার্গে আবার হিউমান কার্টুন নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। শুরুতেই স্কেচগুলো রেডি। গল্পের লাইন আপের সাথে আপাতত ফিট। এবার স্প্লিনিং এর কাজ শুরু। প্রেমের গল্প। মাঝে খানিক অ্যাকশন। ট্র্যাজিক এন্ডিং - মেয়েটি ছেলেটিকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য দেশে। সবকটা লেয়ার শেষ করতে বহুদিন লাগলো। গতরাতেই শেষ লেয়ারে কাজ করেছেন। আজ ঘুম থেকে উঠতে সার্গের অনেক দেরি হলো। এরকম দেরি হলে অবশ্য সার্গের দিব্বি লাগে। কফি খেতে খেতে অনিয়মের দুপুর পেরোয়। বিকেলে বসলেন স্মুথিংয়ের কাজ করতে। শেষ লেয়ারগুলোতে হঠাৎই চোখ পড়লো। এরকম ঝকঝকে রং ছিল না বলেই মনে পড়ে সার্গের। বিদায়বেলা মানেই সমবের টাচ, হালকা নীল। কিন্তু এতো লাল রং। এরকম ভুল তো সার্গের হওয়ার কথা নয়। তা যদি হয়ও, ছেলেটি খিলখিলিয়ে হাসছে? কি করে সম্ভব। কালই তো ছেলেটির ফেস এক্সপ্রেশনের ইম্পেরফেকশন কারেকশন করলেন সার্গে। ছেলেটির থাকবে স্যাড এক্সপ্রেশন। তার বদলে হাসি! প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ফোন করলেন সালভাদরকে। বন্ধু, সহকর্মী, প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটি মানুষ। ঠিক এই সময় যাকে ভীষণ প্রয়োজন সার্গের। বন্ধু শুনে বললেন, গাঁজা ছাড়া এরকম দুঃসাহসিক কান্ড করানোর ক্ষমতা আর কারোর নেই। কথা বলে সার্গের মনটা ঠিক হলো সামান্য। কিন্তু গাঁজা খেয়ে মাউসে হাত দিয়ে ক্লাইম্যাক্স দিয়েছেন সার্গে এর আগে বহুবার। শুধুমাত্র গাঁজার পরাক্রমে এতো ভুল, স্বাভাবিক লাগছে না সার্গের। তবে বয়সের আক্রমণ ভেবে সার্গে ব্যাপারটাকে আপাত অগ্রাহ্য করে কাজে মন দিলেন। ফাইনাল সেভিংএর সময় ভালো করে দেখে একটা নোট রাখলেন "রেভিউড"।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙলো সার্গের। জল খেতে উঠলেন। চোখ পড়লো কম্পিউটারে। স্ক্রিন অন। অফ করেই শুতে গিয়েছিলেন সার্গে। এতো ভুল একসাথে হতে পারেনা। লেয়ারগুলোতে চোখ বোলাতেই হবে। আবার কিছু পিকুলিয়ার  ..... না আপাতত ঠিকই আছে। একদম শেষে এসে আবার ...... ড্যাম। আবার শেষের লেয়ারগুলোতে ঝকঝকে রং। ছেলেটা? হ্যা, আবার সেই হাসি মুখ। এইতো রেভিউয়েড নোট ওয়ালা ফাইল। এরপরেও এই রং, এতো পার্থক্য! ভুল নয়। ভুল নয়। কোথাও কিছু সমস্যা হচ্ছে। কিছু হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে আবার কখন সার্গে ছবি কারেক্ট করতে শুরু করলেন নিজের অজান্তেই। কিন্তু সব গুলিয়ে যাচ্ছে। নাহ ঠিক করলেন কাল সকালে দেখবেন। সেরকম কিছু গন্ডগোল হলে সালভাদরকে ডেকে নেবেন না হয়। ঘুম হলো না। তন্দ্রা ছিল। সূর্যের আলোর অপেক্ষা ছিল। অনেক শক্তি নিয়ে ফাইল খুলতেই আবার সেই। এবার যেন পাগল হয়ে যাবেন সার্গে। ইনসেন। টেকনিক্যালি সব নিখুঁত। কিন্তু গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঘেটে যাচ্ছে যে।     
লেয়ার গুলো খুঁটিয়ে দেখছেন সার্গে। সব ঠিকই রয়েছে। ঠিক শেষ দৃশ্যে যখন মেয়েটির চলে যাওয়ার কথা, সেখানে সে দৌড়ে আসছে, ফিরছে। ঝকঝকে রং চারিদিকে। আলোয় আলো। ছেলেটি হাসছে। চোখে মুখে ভাস্করতার প্রভা। কিভাবে এসব হচ্ছে! কার্টুন ক্যারেক্টার নিজেরাই কন্ট্রোল করছে! ও কি সম্ভব! এরকম হলে চলে না। পাবলিক দুঃখ গেলে। মার্কেটে সেটাই চলে। এ জিনিস কেউ দেখবে না। সার্গে হঠাৎ অসহায় বোধ করছেন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোলেন টানা ০৩ দিন। শেষে এই ফাইলটাই দিয়ে দিলেন প্রোডাক্শনকে। গল্পের সাথে মেলেনি এরকম একটি কাজ দিলে প্রোডাক্শনের কাছ থেকে যে হেনস্তা হতে হবে তা মেনে নেওয়ার শক্তি নেই সার্গের। যেখানে নিজের বিচার বুদ্ধির ওপরেই জোর নেই। নিজের হাতের ওপরেই ভরসা নেই। যা হচ্ছে, তার কোনো যুক্তি নেই। সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন না সার্গে। উধাও হয়ে গেলেন হঠাৎ। লোকে বলে মেক্সিকোর কোনো গ্রামে আছেন। বাচ্চাদের অ্যানিমেশন সেখান। খুশির অ্যানিমেশন। হাসির।
ওনার শেষ কাজ যার এন্ড ট্রাজিক, তা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলো। ওনার থেকে ট্রাজিক এন্ডিং এক্সপেক্ট করে দর্শক যখন হ্যাপি এন্ডিং দেখলো, চমকটা সেইখানেই হয়ে গিয়েছিলো।
ওই এনিমেশনের শেষে লেখা ছিল, সার্গে, টি এন্ড অফ ট্রাজেডি। 

Monday, 6 January 2020

স্টিমুলেশন

হাওড়ার অলিগলি ঘোরার শেষে এবার একটা গপ্পো তৈরী হয়েছে বোধ হচ্ছে।
বোটানিক গার্ডেন সোমবার বন্ধ। স্বাভাবিক। মানুষ কাজকর্ম করে। জ্যাঠামশাই সে বহু দূর দেশ এদেশে এসেছেন। সোম মঙ্গল মানছেন না। কলকাতার সব কিছুকে একেবারে চেখে নিতে চাইছেন প্রতিটি মুহূর্তএ। তা তার সোমবার কলকাতা চাখার ইচ্ছে হলেও, বাগান দেখার ইচ্ছে হলেও বাগানের মালিকের তো নিয়ম আছে। সোমবার বাগানে ঘোরা সাজে না। বাগানের সামনে গিয়ে সিকিউরিটির লাঠির ভয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি উপায়ান্তর গন্তব্য ভাবতে হবে। স্টিমুলেশন চাই। কচুরি-আলুর বিকল্প নাই। কচুরির দোকানে পৌঁছনো গেলো।
কথায় কথায় জ্যাঠামশাই বললেন, হাওড়া আন্দুলে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে এসেছিলেন এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধু তখন রাজনীতি করেন। জ্যাঠামশাই ডাক্তারি পড়া শেষ করে প্র্যাক্টিসের চেষ্টা করছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাইএর কাটানো গল্প বলতে শুরু করলেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই রাতবিরেতে ট্যাংরাতে চ্যাংড়ামো করেছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই শ্রীহরির সকালবেলার প্রথম কাগজের ঠোঙার কচুরি খেয়েছেন সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই আরেকবন্ধুর বাড়ি গিয়ে বিকেল থেকে রাত অব্দি বন্ধুর মা কে বুঝিয়ে বন্ধুর বিয়ে দিতে রাজি করিয়েছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই-এর শেষ দেখা চল্লিশ বছর আগে। ফোন নম্বর বদলেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আজ তাকে জ্যাঠামশাইএর মনে পড়েছে ভীষণ। এইটুকু শুনতেই আমি তাকালাম জ্যাঠামশাইএর দিকে আর জ্যাঠামশাই? আমার দিকে। হেসে বললেন, "বলছিস?" বললাম, "নিশ্চই, বাগানে যখন তালা ...... চলো খুঁজেই দেখি, আফসোস বড়ো ভয়ানক জিনিস, চেষ্টাটা তো হোক"।
প্রতি এক কিলোমিটার অন্তর চায়ের দোকান, টায়ার দোকান, হোমিওপ্যাথি সর্বত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের প্রশ্ন, "আকাশ ভট্টাচার্য? রাজনীতি করতো? এই সোজা গিয়ে ডান দিকে কোথাও ..... বাবার প্রস্টেট ক্যান্সার হয়েছিল, বয়স সত্তর হবে। চেনেন?" আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রায় সবাই বললেন,"আকাশ? ভট্টাচার্য? দাদা পাড়ার নাম বলুন। ধুস। এভাবে হয় নাকি?" খুব বুদ্ধিমান একজন বললেন,"ফোন নম্বর আছে?" উনি বোধহয় ভেবেছেন আমাদের ফোন নেই। এসটিডি বুথ খুঁজছি।
প্রায় দুঘন্টা সারা রাস্তাতে বুলি পড়ার শেষে আমরা বুঝলাম চেষ্টারও সীমা থাকে। ওই সামনের চায়ের দোকানই সেই সীমা। চা খাই আর যদি খবর না পাই তাহলে এখানেই এ গল্পের শেষ। চা খাচ্ছি আর চা ওয়ালা আমাদের কান্ড শুনছেন। হঠাৎ চিৎকার করে ডাকলেন কাউকে। স্কুটারে বসা এক লোক এলেন, সবটা শুনলেন আর বললেন, "চা খেয়ে আসুন আমার সাথে"। জ্যাঠামশাই এর চোখ চকচক করে উঠলো। চা আর কে শেষ করে তখন! পাঁচ সেকেন্ডে ক্লাচে পা। স্কুটারের পিছন পিছন আমরা চললাম। বাম্পারে আর কোমড়ে তখন যুদ্ধ। স্কুটারওয়ালা কিছু দূরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু লোক জড়ো করেছেন। তাঁরা এলেন আমাদের কাছে। আমরা আবার বুলি পড়লাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁরা বললেন," অমুক জায়গায় যান। কিছু খোঁজ মিলতে পারে।" আবার স্কুটার আর তার পিছন পিছন আমরা। সোমবার যেখানে বাগান বন্ধ, এই স্কুটারওয়ালা যে ভাবে আমাদের সময় দিচ্ছেন তা দেখে আমাদের মনে হলো, বন্ধুর দেখা না পেলেও মানবিকতার এই যে দৃষ্টান্ত পাওয়া, কিছু অংশে কম নয়। পিছন পিছন আমরা চললাম। এখানেও দেখা মিললো না। চললাম ডান দিকে। তারপর বাঁ। নাহ। মিলছে না। আমরা হাল ছেড়েছি। কিন্তু স্কুটার ব্যক্তি ছাড়েননি। এক স্থানীয় ব্যক্তির বাড়ি যাওয়ার উদ্যেশ্যে ঢুকেছি যে রাস্তাতে সেখানে চারজন পাশাপাশি গেলেই মেলা তৈরী হয়। সেরকম রাস্তাতে বড়ো ছোটো নানা গাড়ি, মানুষ, কুকুর, বিড়াল, কাক, ঢালা পিচ, গালাগালি আর হর্ন। যাকে বলে জমে ক্ষীর। কোনোরকমে ঢুকছি। আতঙ্কএ বুক দুরুদুরু, এ গলি থেকে বেড়োবো কিভাবে! এ গলিতে ইউ টার্ন নিতে পারেন একমাত্র রজনীকান্ত। অভিমন্যু ফিলিং নিয়ে এগোচ্ছি। ভদ্রলোক দাঁড়াতে বললেন। আমরা দাঁড়ালাম। পাঁচ মিনিট পড়ে ভদ্রলোক দৌড়ে এক গাল হেসে গাড়ির কাঁচের কাছে এসে বললেন, "বেরিয়ে আসুন। পেয়েছি"।
-হ্যা? বলেন কি? পেয়েছি মানে?
-হে হে পেয়েছি। আকাশবাবুর দাদা এনার বন্ধু। বহু পুরোনো বাসিন্দা এনারা। ইনিও রাজনীতি করতেন। তাই যোগাযোগ .....

তারপর বনেদি বাড়ির মুড়ি-চা, দুপুরের খাওয়ার ইনভিটেশন, আকাশবাবুর ছেলের হন্তদন্ত হয়ে আসা, আমাদের দেখে "এও সম্ভব" জাতীয় মুহূর্তের হা হওয়া, আমাদের তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, আকাশবাবুর জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরা, দুজনের আমাকে পাগলের মতো পুরোনো গল্প শেয়ার করা, স্কুটারওয়ালার চোখের কোণে জলের চিকচিক, আরও কত কি।

আমার চোখের সামনে আকাশ-বাতাস-সময়-মানুষ-ইমোশন সবাই মিলে একটা গপ্পো তৈরী করলো বটে।

Tuesday, 20 March 2018

ভিক্টিম শেষে চড়াই

কিউট অথচ শো-অফ হীন।
পুচকে, নাদুসনুদুস, কঠিন-দৃঢ়-অভিমানী ঠোঁট। অথচ নো শো-অফ। দিব্বি আশেপাশে ঘুরে বেরায়। বদ্রি-লাভবার্ড -এর মতো দুর্লভ নয়। তা বলে কি এলেবেলে নাকি? আত্মসম্মানে বিদ্যাসাগর। কখনো খাঁচার মধ্যে দেখেছেন ওকে? হু হু বাবা।
কিন্তু এই কলকাতায় বেচারাদের মোটে কদর নেই। দাঁত থাকতে দাঁতের আর চড়াই থাকতে চড়াইয়ের মর্যাদা নেই।
ভাবুন যার চিকচিক আওয়াজে বিরক্ত হয়ে জানলা বন্ধ করছেন, একদিন তাকে আর দেখতেই পেলেন না।
এর প্রসেস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। আমার মুম্বাইবাসী বন্ধু জানলায় একটা চড়াই দেখবে বলে আজ হাপিত্যেশ করে। মুম্বাইতে গাছ-টাছ কেটে মানুষ নিজেদের জায়গা করে নিতে ব্যস্ত। চড়াই কি আর পুলিশ কমপ্লেইন করতে পারে? মোবাইল টাওয়ার বসানো অনেক বেশি জরুরি। চড়াইকে তো আর ফোন করতে হয়না বর-বৌ-বাচ্চাকে। ওদের উড়ে যাওয়ার পাখা আছে। চুপিচুপি শুনে রাখুন, মুখ ভেংচে চোখ উল্টে পড়ে যাবেন না যেন। আমাদের দেশে বেশ কিছু লোক চড়াই-কারি বানিয়ে খান নিয়মিত। ওই আর কি, কামোত্তেজনা- ফামোত্তেজনা বাড়াতে। আমাদের দেশের একম-অদ্বিতীয়ম-লক্ষ্যম কামোত্তেজনা। ফ্রি ফান্ডে, "তোমাকে দেখাবো নায়াগ্রা তোমাকে শেখাবো ভায়াগ্রা" এর ভিক্টিম শেষে চড়াই।
এই চড়াই-উতরাই আর সহ্য করতে না পেরে কিছু বুদ্ধিমান চড়াই বিদেশে পালিয়েছে বা পাতি মরেছে, বেঁচে গেছে। যেকটা কিউট ভারতবর্ষে পরে আছে, তাদের পোড়া কপাল।
গ্রীকদেবী আফ্রোডিট-এর ভালোবাসার প্রতীক স্বয়ং তুই।
এ যে পোড়া ভারত, চড়াই, ভালোবাসার দাম এখানে নেই।
তবু যদি অধমের দু-চার কথা শোনেন, বলি যে,
১. একটু জানলার ধারে জল রাখুন, একটু পান করে বাঁচুক বেচারা
২. পারলে একটু দানাও দিন
৩. গাছ লাগাবেন এ আর নতুন কথা কি
একটু হোক না। ক্ষতি কি।

Thursday, 8 February 2018

পদ্মাবত এবং টিয়া

পদ্মাবত নিয়ে এ যাবত অনেক ঘোল-শরবত হলো। ওসব নিয়ে না চাইলেও চোখের সামনে, কানের পাশে, হাতের ডগায়, মাথার আগায় যা সব চলছে, তাতে খুব চিন্তিত। না, চিন্তা দেশ নিয়ে নয়, দীপিকার মাথা নিয়েও নয়, বনশালির কুশপুতুল নিয়ে তো নয়ই। চিন্তা ওই টিয়াটিকে নিয়ে।
এ? টিয়া কোথা থেকে এলো!
সিনেমাটি না দেখে থাকলে, নিদেনপক্ষে রানী পদ্মিনীর গল্পটা না পড়ে থাকলে, নিশ্চয় ভূরু কুঁচকে এটাই ভাবছেন।
তা কেসটা এরকম।
বেশি সুন্দরী মেয়ে মানেই মেয়ের বাবারা বাই ডিফল্ট অমরেশ পুরি। এ দেশে অবশ্য তা ছাড়া উপায়ই বা কি! যাক সে অন্য প্রসঙ্গ।
তা পদ্মিনীও সুন্দরী। (সে তো দিপিকা পাডুকোনকে নাম ভূমিকা নায়িকা হিসেবে দেখেই আন্দাজ করেছেন) তাই পদ্মিনীর বাবারও মেয়েকে সামলানোর প্রবল চাপ। কারোর সাথে কথা বলা বারণ পদ্মিনীর। এখানেই এন্ট্রি টিয়ার। হ্যা পাখি। যে সে পাখি নয়, কথা বলা পাখি। তা তার সাথেই জমে ওঠে পদ্মিনীর, সরল বন্ধুত্ব। টিয়াটির বেশ চকচকে নামও দেওয়া হয়, হীরামন। এই বন্ধুত্বর চাকচিক্য দেখে, মেয়ের বাবার আবার চাপ। বোধহয় এই জন্য যে পাখিটি ছেলে। ছেলে পাখির সাথেও কথা বলা যথেষ্ট রিস্কি মনে করাতে পাখি-হত্যার হুকুম জারি হলো। ব্যাস, টিয়া অমনি জান বাঁচিয়ে ভাগ মিলখা। এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে হাত বদল হয়ে সে এবার রতন সিংহের পোষ্য।
গল্প এতদূর শুনলে, বেচারা টিয়া আর পদ্মিনীর বিচ্ছেদের দুঃখে মনটা কিরকম কিরকম ভারী হয়ে আসে শ্রোতার। হওয়ারই কথা।
তা টিয়ার হঠাৎ খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, পদ্মিনীর রূপ নিয়ে গল্প করতে থাকে রতনের কাছে। ব্যাস রতনেরও, দিল মে লাড্ডু ফুটা। আরে বাবা, ছেলেদের হৃদয় হলো সেই ভালোবাসার তেঁতুল পাতা, সুজন-নজন আরও কতজনই আসুক না কেন, ঠিক ফিট হয়ে যায়। রতনেরও তাই। বাড়িতে অলরেডি বৌ বর্তমান, তবু লাড্ডু ফুটা তো ফুটা। এইসময় বলি টিয়ার আক্কেলটাই বা কি হ্যা? নিজে পাখি হয়ে ঝাড়ি মারলি, তার থেকে বেশি কিছু হবে না জেনে আরেকজনকে লেলিয়ে দিলি! পদ্মিনীর বাবার পাখিকেও সন্দেহ করা যে একেবারেই যুক্তিসঙ্গত, তা আর বলতে বাকি রাখে না।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, মেয়ের বাবারা যদি এ লেখা পড়ছেন, একদম নোট করে নিন। কাউকে বিশ্বাস করা নয়। বাড়িতে কাক-চিল-এমনকি ভোডাফোনের কুকুরও যেন বসতে না পারে।
যাই হোক, সে টিয়াটি এমন ইয়ে, যে সে রতন সিংকে পদ্মিনীর ঠিকানা জানায়, উড়ে গিয়ে পদ্মিনীকে দেখা করার ডেট-টাইম অ্যাডভান্স জানিয়ে দেয়, মানে জিপিএস-হোয়াটস্যাপ এর কম্বো, ওই একাই হীরামন টিয়াটি। এরপর তো মহাকান্ড। সাত সমুদ্র পার করে রতন পৌঁছয়, হেব্বি ঝামেলা ঝঞ্ঝাট সামলে রতন-পদ্মর বিয়ে হয়, তাতেই কি শেষ? সাথে জীবন-যুদ্ধ সামলানো, সতীনের সাথে হাল্কা কূটকচালি ম্যানেজ করা ওসবও হয়। কিন্তু ও নিয়ে আমার গল্প নয়। কারণ ওতে টিয়া নেই। শুরুতেই বলেছি চিন্তা আমার টিয়া নিয়ে।
সুফি কবি জয়সির লেখা অনুযায়ী, ওই টিয়াই নাকি কি এক কারণে রতন -এর থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং আরও একবার খুজলি করে, এবার একেবারে স্বয়ং আলাউদ্দিন খিলজীকে। আর তারপর তো খেল খতম, আর পয়সাও হজম হয়না। এই পোরশনটা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। মানে টিয়াটির চাপা-শয়তানি ঠিক কতদূর তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আর এখানেই আমার চিন্তা।
প্রশ্ন হলো, চাপ তো এখনো আছে। টিয়াটি কোথায়? সে তো এখনো ফ্রি বার্ড। আরে বাবা, জানি জানি বলবেন এতো বছর হয়েছে, তো থোড়ি সে পাখি আছে নাকি। আরে বাবা, জন্মান্তর বলেও তো কথা আছে, তাই না? আর তাছাড়া তার যে বংশবৃদ্ধি হয়নি, তাই বা কে বলতে পারে। প্রেমে ভাংচি দেওয়া ইয়েরা ওই ওরই বংশধর যে নয়, তা কে বলতে পারে।
তাই আর কি, একটু চাপে। এরা আশেপাশেই ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। দেখছেনই এই এতবছর পরেও রতন-পদ্ম-খিলজী যা চাপে, তাতে আপনাদের কে বাঁচাবে।
তাই সবাই সাধু সাবধান।

Monday, 13 November 2017

নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি

মেজোমামার বিয়েতে তার সঙ্গে প্রথম দেখা। না ঠিক দেখা নয়। আড়চোখে পলক ফেলে ফেলে নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি কে একটু বুঝে নেওয়া। কালো ধুতির চল সে সময় ছিল না। তাই সবার চোখই ছিল তার ওপর। নানারকম চাহুনি, যেমন “কি বোকা বোকা” “একি অদ্ভুত” “বাহ্ বেশ হাটকে তো” ছিল বটে। কিন্তু তাতে তাকে মোটেই অপ্রতিভ মনে হচ্ছিল না। বরং যেন একটু বেশিই স্বচ্ছন্দ। আর তাতে আড়চোখ আরও বেশি করে তাকেই খুঁজতে লাগলো। তার চোখ দু-একবার আমার চোখকে অ্যাকনোলেজ করেছিল বটে তবে খুব দ্রুত। ইতিমধ্যে এই পুরো সাইলেন্ট টেলিফিল্মটা কখন যে আমার ভাই ট্র্যাক করতে শুরু করেছে জানি না। মালা–‌বদলের ভিড়ে আমার কানের কাছে এসে বললো, “লাভ নেই। এনগেজড। আমাদেরই কোচিংয়ের মেয়ের সঙ্গে” । ড্যাম। চুরি করে ধরা পরে যাওয়া, তাও আবার সে চোরাই মাল যদি অকেজো হয়। ফিলিংসটা ঠিক কেমন হয় বলুন তো! যাক চোখাচুখি নিয়ন্ত্রিত হল তখুনি। সোনু নিগম হয়ে বিড়বিড় করলাম, জানা নাহি থা পিয়ার কি গলি মে।
===============
প্রায় ৭-৮ মাস পরে, অক্সিজেনে তখন পুজো পুজো গন্ধ। নতুন জামার মসমস, নতুন জুতোর ফোস্কা, পুরনো বন্ধুর হইচই, পুরনো রেস্টুরেন্টে নতুন মেনু, সব চলছিল নিজের তালে। উলটোদিকের টেবিলে আমাদের মতোই আরেক দল, একইরকম হুল্লোড়ে মত্ত। শুধু মুখগুলোই অচেনা ….. উহু একটা মুখ তো বেশ চেনা। আরিব্বাস। নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি যে। আজ সাদা শার্ট নীল ডেনিম। আর সঙ্গে সঙ্গেই মাথা বলে উঠলো, “না না, আর ও পথে না”। ব্যাস সোনু নিগম হয়ে বিড়বিড় করলাম, জানা নাহি থা পিয়ার কি গলি মে। কিন্তু ওপার থেকে ফোর জি নেটওয়ার্কের মতো শক্তিশালী চোখ যেন আমাকে ফলো করছে মনে হল। ইগনোর করতে, আরও বেশি করে মন দিলাম বিরিয়ানিতে। সবে দু-চামচ মুখে দিয়ে বিরিয়ানিতে মেডিটেশন শুরু করেছি, ওমনি “হাই, ডু উই নো ইচ আদার ….. ” সাদা শার্ট নীল ডেনিম আর তার দলবল, চোখের সামনে। কতক্ষণ হা করে ছিলাম মনে নেই। বাকি কী বলে গেল, মনে নেই। আলাপচারিতার শুরু। সুতপা কনুই-এর গুঁতো মেরে বলেছিল,”এই সেই? খবরদার। এনগেজেড কিন্তু।” এরকম সাবধান বাণী শুনে মনে হল, যেন ও সাবধান না করলে আমি যে কোনও মুহূর্তে সাদা শার্ট নীল ডেনিমকে জড়িয়ে ধরবো। আশ্চর্য্য। তা সেই সাবধানবাণীর ঠেলায় বা বিরিয়ানি কন্সেন্ট্রেশনে বাঁধা পড়ায়, আলাপচারিতাতে কন্সেন্ট্রেট করতে পারিনি। আমি মূলত শ্রোতাই হলাম। শেষে অবাক করে দিয়ে সুতপা হঠাৎ নবমীতে ম্যাডক্স স্কোয়ারের প্ল্যান বানিয়ে বসলো। সুতপাকে বুঝতে পারে কার সাধ্যি! আবার দেখা হওয়ার এক্সাইটমেন্ট যে আমার মধ্যে একেবারেই ছিল না তা বলা ভুল। মাস্কারা লাগালাম একটু ঘন করেই। না না, আর কিছু না। একটা প্রেজেনটেব্‌ল লুক তো দরকার, নাকি! তবে সুতপা-বুবাই দের সঙ্গে বেরোলে কেন এ কথা মনে হয় না! ওরা ছোট্টবেলার বন্ধু বলে! ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডা তখন চরমে, সাদা শার্ট নীল ডেনিম আমার কানে ফিসফিস করে বললো, “হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে। কাল একবার লেকে মিট করা যায়? সেই বিয়ে বাড়ি থেকে ট্রাই করছি। না বললে শুনবো না কিন্তু।” হার্টবিট ১১০। আচ্ছা এমন বুক চিনচিন করে কেন বলুন তো যখন মাথা আর মন ঝগড়া করে? মাথার শত অ্যালার্টকে মিথ্যে করে, দেখি না কী বলতে চায়, শুনতে মন চলল দশমীর বিকেলে, লেকের ধারে। পৌঁছনোর দু-কিলোমিটার আগেই এসএমএস, “নাহ সামনাসামনি বলার সাহস নেই। অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে। ক্যান ইউ হোল্ড মাই হ্যান্ড? ফর লাইফ?” মোবাইল থেকে চোখ তুলে মনে হল আশেপাশের কিছু লোক হা করে দেখছে আমায়? খেয়াল করলাম আমার মুখটা এক গাল হাসিতে ভরে গেছে কখন, আমার অজান্তেই! অক্সিজেনে এখন নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতির গন্ধ। আশেপাশে লুকিয়ে আমায় দেখছে না তো? বাড়ি ফিরে ভাইকে একটা কিল মারবো ভাবছি।

Tuesday, 3 October 2017

এই উইকেন্ডে দেখা করবে?

বং-রা বলেন, রবিঠাকুর-মান্না-কিশোর নিয়ে বাঙালি ন্যাকাপনা লেবু চটকে একেবারে তেতো। শুধুই কি বলেন? কোনো কোনো সাহসী বং এগিয়ে এসে নতুন লেবু প্রোডিউসও করতে চান। গিটার-ক্যানভাস-বাংলা কিবোর্ড এপ্লিকেশন, অস্ত্র-সস্ত্র যা সহজে পাওয়া যায়, নিয়ে এগিয়ে পরেন। ফেসবুকে পেজের পর পেজ বাড়ে। ইউটিউবে চ্যানেল এর পর চ্যানেল। দুদিন যেতেই অস্ত্রে ভ্যাজাল বেরোয়। কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র নেই বলে পিছিয়ে যাওয়া? উহু নাহ। বরং এর ওর বাগান থেকে লেবু চুরিটা বেটার। তাই শুরু হয়। তাতে পৃথিবী বদলায় না। উল্টে ঘড়ির কাঁটা বদলায়। কিছুতেই আকাশের রং সবুজ আর গাছের রং নীল হয়না। এইটা মোটামুটি চলে ধরুন এই বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ অব্দি। কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে এরপর তারাই আবার নিজেরাই লেবু চটকানোতে ফিরে আসেন। বা ঢাউস গদিতে এক পা আর একটির ওপর তোলার চেষ্টা করে হুইস্কী-র গ্লাসে সুপ করে চুমুক দিয়ে "ধুর শ্লা বাঙালি" বলে নিজের জীবনপথের যত-সমস্ত পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে নেন। একে বলে চক্র। লেবু চক্র।
ভাত-ডাল থেকে via ইডলি-সাম্বার বাঙালি পাস্তাতে সহজেই আস্থা পেয়েছেন। ধুতি থেকে via বলিউড বাঙালি হলিউড ডুড হয়েছেন। তাতে কি। আর একটা রবীন্দ্রনাথ জন্মালে ঠিক যে আবার ইউ-টার্ন মারবেন, সে মনে মনে জানা। ঠান্ডা ঘরে মিটিংয়ের পর মিটিং শেষে, ইংরিজি কপচে, দুহাত দিয়ে মাথা চেপে যখন ল্যাপটপ স্ক্রিনে তাকিয়ে। হঠাৎ হোয়াটসাপে টুং। "তুমি যে শিশির বিন্দু মম কুমুদির বক্ষে না হেরিলে ওগো তোমারে তমসা ঘনায় চক্ষে।"। ম্যাজিক কাজ করে না বলুন? গায়ে বাঙালি কাঁটা গুলো সোজা হয়ে বলে ওঠে "ওহ, শ্লা বাঙালি", হাতের আঙ্গুল গুলো মাথা থেকে নেমে ওই পুরোনো বাংলা কিবোর্ডে টাইপ শুরু করে, এমনি এমনি,"আমি যামিনী তুমি শশী হে ভাতিছ গগন মাঝে, মিস ইউ। এই উইকেন্ডে দেখা করবে?"

গোলবাড়ি

এক প্লেট মটন কষা। এক প্লেট মটন কিমা। সাথে পরোটা। ব্যাস এইটুকুই। 
তাং মাত কারো। 
বাকি কিছু মনে নেই, মশাই। মনে থাকার কথাও নয়। মেডিটেশন -এ কতটা কন্সেন্ট্রেশন লাগে, সে যারা করেন তারা জানেন, বোঝেন। মনপ্রাণ এক করে চিন্তন-মননকে ভাসিয়ে দিয়ে তবেই তো আধ্যান। গাঢ় খয়রী রং আর তেলের ভাবাবেগের মাঝে সে আধ্যান তখন পিকে। আমির খানের পিকে নয়। ইংরিজি পিকে। মানে শীর্ষ-এ। ঘোর কাটল যখন সামনের প্লেটে লেগে তেলের বিন্দু। হাত ভার্টিক্যালি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আঙ্গুল চেটে ফিনিশিং টাচ চলছে তখন, কানে ভেসে এলো,"গোলবাড়ি কেন গোল নয়", "গোলবাড়ির কেন কোনো শাখা নেই", "গোলবাড়ি কেন এতো ঘিঞ্জি", "গোলবাড়িতে কেন এসি নেই", "গোলবাড়ির মেনুতে অপসন এতো কেন কম".
হে মহাজীবন .....
নাহ মানুষের দেখছি কন্সেন্ট্রেশনের খুব অভাব। মটন কষাকে সামনে পেয়েও ফোকাস করতে পারছে না। হৃদয়বিদারক এ ঘটনার আঘাত সামলাতে, প্রতিবাদ স্বরূপ কালো কাপড়, না না কাপড় নয়, ওই কালো রগরগে মটন কষাই ওই আর কি ইয়ে এক প্লেট অনলি, সাথে মটন কাটলেট আর মটন চাপ প্যাক করানো গেলো। এ শুধুমাত্র জাতির উদ্দেশ্যেই। প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে।


Tuesday, 4 July 2017

জিরো

 -কিরে মুখটা ওরকম করে আছিস কেন?
- মামা, পাউট প্র্যাক্টিস করছি। এ এ এ মমম ঐটা হলো পাউট। সেলফি নিতে লাগে, আবার উত্তমবাবুর মতো গোল গোল ধোঁয়া ওড়াতেও লাগে।
- তোদের পাউটে ইয়ে..... ও সব জিরোর খেলা।
- জিরো? সেটা কোথা থেকে এলো।
-তুই একটু জিরো বাবা। আমি বোঝাচ্ছি। উত্তম বাবুর মুখ থেকে কি বেরোচ্ছে? জিরো, মানে শূন্য. বুঝলি?
- ও।
- ইয়েস ও। জানিস কি আদিম টাইপরাইটার-এ দেয়ার ওয়াস নো জিরো। জিরোর কোনো লিখিত গুরূত্ব সেখানে নেই। ইংরিজির o দিয়ে কাজ হয়ে যেত তো।
- ও। তা আজকাল তাহলে জিরোর আলাদা বাটন কেন?
- অভিমানী জিরোর আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হওয়াতেই..... তাছাড়া o কিরকম ওয়েইট গেইন করেছে দেখেছিস? ক্যালোরি নিয়ে ওর চিন্তাই নেই। ওদিকে জিরোকে ওসব নিয়ে ভাবতে হয়। পৃথিবীর শুরু এবং শেষএর মাঝে আছে শূন্য। সাংঘাতিক রিস্কে। তাই তো একটা স্লিম o হিসেবে জিরো। আবার অঙ্কের হিসেবে যা নাল, পাতি ভাষায় বাতিল।
-মানে কোনো দাম নেই?
-আছে। দৃষ্টিভঙ্গির বদলে। এই যে দূরদেশে ফোন করবি? শুরুতেই একটি শূন্য ছাড়া সে নম্বর ডায়াল করা অসম্ভব। মানে জিরো হলো শুরু। আবার হিমাঙ্ক হিসেবে দেখ। শূন্যতেই তরল থেকে কঠিনে পরিণত হওয়া। মানে ঘুরে দাঁড়ানো অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
-মানে পসিটিভিটি?
-মমম মানে নেগেটিভিটির আগের অবস্থা। যেমন অণু-পরমাণুর খেলা। নিরপেক্ষ, প্রশমিত, উদাসীন। এক তুরি নয়, ওই এক শূন্যমার্কা ফুঁ ই দিতে পারে সব লন্ড-ভন্ড করে। এই যে কথায় কথায় "ও" বলছিস। মানে সম্মতি। আবার সভ্যতার ভাষায় সম্পর্কশূন্যতাসূচক অবস্থার ঠিক আগের মুহূর্ত। মানে একেবারে নেই তা নয়, আছে। আবার মুহূর্তে তা নেই হযে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। ওই সম্ভাবনা। ঐটি হলো শূন্য। শূন্য মানে সম্ভাবনা। 


Thursday, 8 June 2017

আজকের বিশেষ খবর

আজকের বিশেষ খবর:
তারাতলার কাছে মাঝরাস্তায় বসে আছেন এক ভদ্রলোক। বাবুই পাখির মতো শুধু হাত দিয়ে কপালে আঘাত হানছেন। চারিদিকে লোক জড়ো হয়ে গেছে। বাস এগোতে পারছে না। পুলিশও বমকে গিয়েছে। অটো-ট্যাক্সি-সাইকেল সবাই অত্যন্ত বিরক্ত। তারাতলার ট্রাফিক আবার সমস্যার মুখে। আমাদের প্রতিনিধি পৌঁছে গিয়েছে ইতিমধ্যেই, প্রত্যেকবারের মতোই সবার প্রথম। জনগণের খবর নেয়, জনগণকে খবর দেয়।
- হ্যালো ঋক, হ্যালো, শুনতে পাচ্ছো, হ্যালো, কোনো যান্ত্রিক গোলমালে বোধহয় লাইনটি কেটে গেলো। আবারো জানাই, তারাতলার কাছে মাঝরাস্তায় বসে আছেন এক ভদ্রলোক। বাবুই পাখির মতো শুধু হাত দিয়ে কপালে আঘাত হানছেন.... হ্যালো ঋক, হ্যালো, শুনতে পাচ্ছো … আবারো কোনো যান্ত্রিক গোলমাল … হ্যালো … আবারো জানাই, তারাতলার কাছে মাঝরাস্তায় বসে আছেন …ওহ এই তো যোগাযোগ করা গিয়েছে ঋকের সাথে। ঋক, আমাদের জানাও কি অবস্থা ওখানকার।
- হ্যালো নবনীতা, হ্যালো হ্যালো নবনীতা
- হ্যালো ঋক, হ্যালো, আমরা শুনতে পাচ্ছি তুমি বোলো।
- ধুস মাইকটা লাগা ঠিক করে এদিকে। ইয়্যা ও ও হ্যালো নবনীতা … হ্যা শুনতে পাচ্ছো … হ্যা ভদ্রলোক এখনো মাথায় হাত দিয়ে, কিছুই বলছেন না। ক্যামেরা নিয়ে যাচ্ছি তার কাছে। এই যে শুনুন, আপনাকে সমস্ত বাংলা দেখছে, বলুন কি ব্যাপার আপনার। এভাবে কেন বসে আছেন? এই যে শুনছেন?
ভদ্রলোক (ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এসে) - য়্যা? ক্যামেরা, সবাই দেখতে পাচ্ছে? চৌরাস্তার সবাই? আমাকে শুনতে পাচ্ছে?
- হ্যা নিশ্চয়। আপনি লাইভ। দর্শকদের জানান, সবাই উদগ্রীব হয়ে বসে আছে।
- ও, (ক্যামেরার দিকে আরও এগিয়ে) ওরে ওই হারামজাদা ঘনা, ওরে ওই ঘনা শুনতে পাচ্ছিস? ঘনেশ্বর ঘোষ? শুনতে পেয়েছিস? তুই পালিয়ে পাড় পাবি না রে, বুঝলি? তুই ব্যাকস্ট্যাব করলি রে হারামজাদা? আমার জীবনের একমাত্র খুশি তুই এভাবে ছিনিয়ে নিলি? একমাত্র খুশি। পাপ লাগবে তোর পাপ। তোর বিবেক কাঁদলো না রে ঘনা? তুই মানুষ? আমি কেস করবো। আমি সুপ্রিম কোর্ট অব্দি যাব। শেষ দেখে ছাড়বো।
- ও নবনীতা, দেখতেই পাচ্ছো। কিছু মারাত্মক হারিয়েছেন ভদ্রলোক। আচ্ছা আচ্ছা, আমাদের একটু খুলে বলুন প্লিস মিস্টার ঘনা কে? উনি কি আপনার পরিচিত? উনি কি করেছেন? চুরি? ডাকাতি? আপনার মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে? আপনার বৌয়ের প্রতি কুনজর? আপনাকে কি আঘাত করেছে? আপনি কি রুলিং পার্টির? মিস্টার ঘনা কি বিরোধী দলের.....
- আরে দাঁড়ান মশাই, কোথা থেকে কি টানছেন? আমার গিন্নির রান্নার স্বাদ বুঝলেন এক্কেবারে স্বর্গসুখ। আজ টিফিনে ছিল লুচি আর ইয়ে মটন। শালা ঘনার বাচ্চা সবকটা লুচি একেবারে থরেথরে সাজিয়ে রেখে সমস্ত মটন সাবাড় করে হাওয়া? এই দেখুন টিফিন বক্স, দেখে বোঝার উপায় নেই, যে এতে কখনও মটন ছিল বলে। নেহাৎ আমার কাছে প্রমাণ আছে, এই যে গিন্নির এসএমএস, "আজ মটন দিলাম আমি, অনেক অনেক হামি”.

- (ঢোক গিলতে গিলতে) য়্যা? ঠিক ঠিক আছে, নমস্কার, ক্যামেরায় ভ্যাবলার সাথে আমি ঋক, জনগণের খবর নেয়, জনগণকে খবর দেয়। 

Tuesday, 23 May 2017

রেসিপি অফ ডেলিসোপ

উপকরণ:

  • ·      স্কুললেভেল মেয়ে (প্রেফারেবলি বোকা বোকা গোল মুখ এবং ফর্সা), কলেজেলেভেল ছেলে (প্রেফারেবলি পেশীবহুল, বাকি যা হোক হলেই হলো),
  • ·      দুটি পঁচিশের কাছাকাছি মহিলা (একটি অবশ্যই বোকা বোকা গোল মুখ, আরেকটি অবশ্যই সুন্দর লম্বা এবং প্রেফারেবলি ফর্সা মুখ),
  • ·      পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি ভদ্রলোক (প্রেফারেবলি পেশীবহুল, বাকি যা হোক হলেই হলো),
  • ·      জনপ্রিয়মুখ মাঝবয়সী একজন মহিলা এবং পুরুষ



প্রণালী: 


স্কুললেভেল বোকা বোকা মুখ মেয়েটি ও পঁচিশের কাছাকাছি গোল মুখ মহিলাকে বেশ কিছুক্ষন ভাসতে দিন। 
পঁচিশের কাছাকাছি সুন্দর-লম্বা-ফর্সা মুখ মহিলাকে পর্দার আড়ালে থেকে নাড়াচাড়া করতে দিন। 
দেখবেন স্কুললেভেল বোকা বোকা মুখ মেয়েটি ও পঁচিশের কাছাকাছি গোল মুখ মহিলা বেশ ফুটতে শুরু করেছে। 
বেশ ঘন হয়ে এলে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি ভদ্রলোককে মাঝে মাঝে ওর মধ্যে ছিটিয়ে দিন, সাথে সাথে নাড়তে থাকবেন। 
দেখবেন যেন ভালো করে ঘেঁটে যায়। 
বার বার খালি জল ঢালুন। 
(অ)রুচিমতো কলেজেলেভেল ছেলেটিকে এবার মেশান। 
বাসি গন্ধ বেরোনো অব্দি চালিয়ে যান। 
বাসি গন্ধ যখন বেরোতে সবে শুরু করেছে, মানে টেকা-দায়ের ঠিক পৌনে ছয় সেকেন্ড আগে, কলেজেলেভেল ছেলেটিকে চিমটে দিয়ে আলাদা করে বের করে এনে টেনে-হিচড়ে-তুবড়ে-তাবরে রংবদল করে আবার মেশান। 
বেশ খানিক মেশানোর পরে শুধু নাড়িয়ে যান। 
জনপ্রিয় মাঝবয়সী মহিলা এবং পুরুষকে হাটের মাঝে হাড়ির মধ্যে বসিয়ে দিন। ওতে স্বাদে কিছু হেরফের হবে না। শুধু গার্নিশিং এর জন্য। আর ওটাই শেষ সাময়িক বিকল্প।
অতঃপর ল্যাজেগোবরে হচ্ছে বুঝবেন যখন, আর কোনো উপকরণও হাতে নেই, ব্যাস গ্যাস নিভিয়ে দিন। 
রান্না আপনার শেষ হলো। 
এবার পরিবেশন করতে করতে চুপচাপ কেটে পড়ুন। 

Monday, 8 May 2017

লাবণ্যর জীবন

দৃশ্য ১:

উফফ, সংসারের সব দায়িত্ব আমার তাই না? কেউ কিচ্ছু করবে না! পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকবে! এ সংসার আমার একার যে। তাই না? 
 উফফফ, কি নোংরা করে রেখেছে ঘরটা। এই পঁয়তাল্লিশের কোমড় তো এবার বিদ্রোহ করবে। আর কত কি সামলাবো বলতে পারো? তোমাকে আর কি বলবো? দূরে দাঁড়িয়ে আমার কথা শোনো আর ভাবটা এমন যেন কিচ্ছুটি জানো না। তাই না? এই লাবণ্য ছিল বলে বেঁচে গেলে হে অমিত রায়। ওওওওই মুচকি হাসি ব্যাস। ওতেই সব রাগ গলে জল। হা হা। 
আচ্ছা তোমার ওপর কিছুতেই রাগ করতে পারিনা কেন বলতো? তোমার ওই চাহুনিতে কি যে খুঁজে পাই কি বলবো। তোমার ওই চাহুনি? উফফফ এখনো মনে আছে সেই প্রথম ছোঁয়া? সে কি শিহরণ কি বলবো। তুমি সাথে থাকলে দিনগুলো কাটে হ্যারি পটারের ম্যাজিক ওয়ানডের মতো। কেন যে মাঝে মাঝে আমাকে একদম সময় দাও না। ওরে বাবা, আচ্ছা আচ্ছা সে অভিমানের কথা না হয় আজ বাদ দিলাম। ঠিক আছে তো এইবার?কিন্তু সেইদিন কি যে হলো, আমি কি আমার মধ্যেই ছিলাম না? কি যে হলো হঠাৎ? সকাল থেকে বৃষ্টি। পেন-খাতা নিয়ে সারাটাদিন হাঁ করে ছিলাম। একটা শব্দ বেরোলো না। এমন মাথায় আগুন জ্বললো। আসলে মনটাই ভালো ছিলোনা হয়তো। পেনটা ছুঁড়লাম আর পড়বি তো পড়, তোমার ...... ইশ ইশশ এই এই যে এখানে এখনো দাগটা রয়েছে। এযে মহাপাপ। কি করে হলো এই অন্যায়? ইশশ। তুমি আমায় ক্ষমা করতে পারবে? কোনোদিনই? জানি জানি, তুমি ক্ষমা করেছ। কিন্তু আমি পারছি না যে, নিজেকে ক্ষমা করতে। এই দাগ কত চেষ্টা করেও মিলছে না কেন জানো? ও বুঝিয়ে দেয় ওর হিসেবটা এখনো বাকি আছে, ও আমাকে আমার অপরাধ মনে করায়। প্রতি মুহূর্তে। না না এটা ঠিক। এটাই ঠিক। এতেই আমার পাপের শাস্তি।

য়্যা রবু? তুই এখানে কখন এলি? এই তুই হাসছিস কেন রে? খুব মজা লাগছে তাই না? জামাটার কি অবস্থা করেছিস বলতো? আয় চেঞ্জ করিয়ে দি। আমার সোনাটা তুই, জানিস, প্রথম যখন তুই এলি আমার কোলে, তোকে ছুঁয়ে প্রথমটায় রোমাঞ্চ লেগেছিলো যেন। নিজের চোখেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না। কত চেয়েছিলাম তোকে মনে মনে। শেষে তুই এলি, ঠিক এলি। তোর গায়ে অদ্ভুত গন্ধ। এখনো মনে করলেই পাই সেই গন্ধ। তুই আমার, এক্কেবারে আমার। তোকে আজ এই সবুজটা পড়াই। খুব মিষ্টি লাগে তোকে এটাতে। আমার সবুজসোনা। ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা … হা হা।

এই সঞ্চু কোথায়? কোথায় গেলো রে? তুই জানিস কোথায় গেলো? সঞ্চু না আমাকে পাগল করে দেবে একদিন। ইচ্ছে করে-করে কোথায় লুকোবে, আর আমি পাগলের মতো খুঁজবো! আমাকে খুঁজতে দেখতে, খুব মজা লাগে ওর। এই কে রে ওখানে কে রে কে রে? খিলখিলিয়ে হাসে যে? খুব মজা না? দাঁড়া তো? দাঁড়া তো? এই তো কাপবোর্ডের পিছনে মনে হচ্ছে, এএএএই এই তো পেয়েছি বদমাসটাকে। হা হা। কি রে? এখানে লুকিয়ে আছিস? দাঁড়া তো? এইকি ওমাগো ………… কেঁটে গেলো কি করে!! তুই আমাকে বলিসনি? ডাকিসনি? এ হে? কাটলো কি করে? এতো ছটফট করিস না তুই! তোকে নিয়ে কি যে করি সঞ্চু। উফফফ আহা আহা কি যে করিসনা বাবা! এরকম করিসনা সোনা। জানিসনা তোদের কিছু হলে আমার কত কষ্ট হয়। একদম বুঝবিনা তোরা? তোরা তিনজনেই তো আমার জীবন রে। একটু বুঝবি না সোনা। আয় আয় সোনা ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দি।
------------------------------------
দৃশ্য ২:

ঘরের মধ্যে,
শেষের কবিতা হেলে আছে একদিকে, তার প্রথম কয়েকটা পাতায় পেনের খোঁচার গভীর দাগ।

রবীন্দ্ররচনাবলি সদ্য নতুন মলাটে আবৃত, সবুজ মলাটে।

লাবণ্য ব্যস্ত, এইমুহূর্তে সঞ্চয়িতার পিছনের পাতার ছিঁড়ে যাওয়া কোণের অংশতে সেলোটেপ লাগাচ্ছে।