Wednesday, 31 July 2019

গটরি অমাবস্যা

বাঙালিরা ডিম, ডিমের কুসুম, মটনের চর্বি থালার কোণায় রেখে দেয়। হিমালয় ঢেকে দেওয়া ভাত, কোপাই নদীর মতো তরকারিতে না কুলোলে, তবু কুতিয়ে কাতিয়েই শেষ করা যায়, কিন্তু ওই স্বর্গীয় বস্তুসমস্ত শেষপাতেই, জমিয়ে এবং অবশ্যই রসিয়ে। ভাগ্গ্যিস আজকাল বিয়ে বাড়িতে বুফে সিস্টেম। নাহলে আইসক্রিমের পর চর্বিওয়ালা ওয়ান পিস্ চাইতে ক্যাটারারদের সামনে হাত পাতা ইস লিটল ইয়ে ইয়ে। মোদ্দাকথা বাঙালি ভালোবাসার জিনিসটি যত্নে সামলায় শেষ পাতে।
তেমনি কালী পুজোর নির্জলা উপবাস। দুদিন আগে থেকেই বাড়িতে নিরামিষ। দিনের দিন তো চোখে মুখেই নিরামিষ ভাব ফুটে ওঠে। লোকজন দেখলেই বোঝে কিছু মর্মান্তিক ঘটেছে। নিরামিষকে আপন করতে পারার থেকে কঠিন আমিষকে দূর করা। আর যেই কালী পুজো শেষ, সকালে উঠেই বাঙালির প্রথম শব্দ, মটন। কালী পুজোর সাথে পাঠাবলির পিছনে কোনো প্রবল খাদ্যরসিক ব্রাহ্মণের যোগাযোগ না থাকলেই নয়।

মারাঠিরা অর্থাৎ মহারাষ্ট্রিয়ানরা উল্টো। শ্রাবণ মাস এ তাঁরা একবেলা খায়, নিঃসন্দেহে নিরামিষ। মদ্যপান? ছিঃ। তাঁরা মনে করে, এই সময় চারিদিকে রোগের সম্ভাবনা বেশি, তাই ভোগের লোভ আয়ত্তে রাখাই যথাযথ। তাই শ্রাবণ শুরুর আগের দিনই তাঁরা গাঁতিয়ে খায়, একে গাতারি বলে। গাতারি অমাবস্যা মানে শ্রাবণের আগের অমাবস্যার দিন। লোকমুখে প্রচারিত ঐদিন লোকজন মদ খেতে খেতে টলে পড়ে নালাতে, তাই এর নাম গটরি অমাবস্যা। চিকেন আর মদ ঐদিন অপরিহার্য। অন্যরকম ভ্যারাইটি স্বাদমতো, জিভমতো, মনমতো, পকেটমতো।



আগামী ০২ অগাস্ট সেই গাঁতিয়ে খাবার দিন। অদ্ভুতভাবে সেদিন আবার শুক্কুরবার। মহারাষ্ট্রে থাকলে তো কথাই নেই, না থাকলেও সেক্যুলার কসমোপলিটন বাঙালি হিসেবে দিনটি উদযাপন করা কর্তব্য। কি বলুন?

Tuesday, 9 April 2019

ভবিষ্যতের ভূত

যে ভূতেরা দুষটু লোকেদের বধ করে, তাঁরাই ভবিষ্যতের ভূত। (ভবিষ্যতের কেন, বর্তমানের নয় কেন তা এখনো জানা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।)
কেন খামোকা এমন সমাজ সচেতনতা? সব ভূতেরা তো এতো সমাজ সচেতন হয়না। আদতে এঁদের ভূত হওয়ার পিছনে সেই সব দুষ্টু লোকেদের হাত ছিল। তাই রিভেঞ্জ।
গল্পের থিম এইটুকুই।
(এই গল্পটি দর্শকদের দেখানো হবে কি না তা নিয়ে একটি নাটক বাস্তবেই হয়ে যাওয়াতে) ভেবে নিতে অসুবিধা হয়না স্বাভাবিকভাবেই এখানে দুষটু লোক অর্থাৎ বর্তমান রাজনীতিবিদরা এবং ভূত অর্থাৎ সাধারণ মানুষ বা ভূতপূর্ব রাজনীতিবিদরা।
ইটস এ বর্তমান vs অল আদার্স-এর গপ্পো।

খুবই সরল-সুন্দর শিক্ষামূলক গল্প, শুরুতে অবশ্য যা ধরতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। গল্প -এ বেশ কিছু (অগুনতি) সাবগল্প ছিল। একটি অন্যটিতে এলোপাথাড়ি দৌড়োয় অবলীলায় দর্শকদের বেগ-আবেগের তোয়াক্কা না করেই। দর্শকরা পথভোলা-অবোলা-দিশাহারা।
সাবগল্পে কি নেই! রিয়ালিটি শোয়ের ছেলেখেলা, মোবাইল গেম-এর নাশকতা, সাংবাদিকতার ত্রুটি, ফিল্মজগতের জাল, নারীজীবনের দর্দ, বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ, যাত্রা কেন হাওয়া, হারমোনিয়ামে রবীন্দ্রসংগীত-এর ক্লান্তি আরও কত কি।
প্রতিটি সাবগল্প নিয়ে শ্রীজিৎদা চাইলে আগামী দশবছরে আঠাশটা সিনেমা নামাতে পারেন এক তুড়িতে। 
তবে যতই সাবগল্প থাক না কেন, প্রতিটিতেই উদ্দেশ্য ছিল কমন। তা হলো বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একেবারে কোনঠাসা করে জীবাশ্ম বানিয়ে দেওয়া। তাতে একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজ দিয়েছে। পথভোলা পাবলিক এতে দিশা পেয়েছেন, বলা যায় "খেয়েছেন"। জমিয়ে এনজয় করেছেন।
এইটে দিয়ে মোটামুটি দু ঘন্টা আর বাকি পনেরো মিনিট বর্তমানকে সান্তনা দিতে ভূতপূর্ব রাজনীতিবিদের নিয়ে উদাহরণ, সংহরণ, প্রহারণ, হৃদয়হরণ ইত্যাদি হয়েছে।
পুরো গল্পে প্রচুর ঐতিহাসিক এবং বর্তমান চরিত্রের স্পষ্ট, সিউডো স্পষ্ট এবং কখনো অস্পষ্ট ছোঁয়া।
গোটা কাস্ট এন্ড ক্রুএর কে প্রধান আর কে গেস্ট তা বোঝা মুশকিল।

সবটা শুনে গল্পটা ট্র্যাক করা যতটা বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে, দেখতে গিয়েও তার থেকে বেশি মনে হবে।
কিন্তু আগেই বলেছি কোণঠাসার ম্যাজিকটা দর্শকদের সিট্ ছেড়ে উঠতে দেয়নি। তা সম্ভব হয়েছে সব্যসাচী, পরান, কাঞ্চন, সুমন্ত, কৌশিক, খরাজ এদের অসাধারণ টাইমিং, অনিক এবং উৎসব এর ডায়লগ -এর জন্য। এঁরা না হাসিয়ে, গোটা গল্পটাকে না ভালোবাসিয়ে ছাড়েনি।


Thursday, 21 March 2019

ভাড়াটে চাই

চন্দ্রনাথ চন্দ্র বাবু বললেন ওনার বাড়ির একটা ছবি তুলে দিতে। ভাড়াটে চাই। ওদিকে দালালের উৎপাত খুব। মোটা কমিশন চায়। তাই অনলাইন এ এড দেবেন। নেইল আর্মস্ট্রং এর পরিবার এরও কেউ ওনার জমির ভাগ দাবী টাবী করবে বলে মনে হচ্ছে না।
ওখানের লোকজন যে ভাড়া চাইছে না তা নয়, তবে সব নেহাতই নাকউঁচু। ওনার ওখানে কারোরই মাটিতে পা পড়ে না। পৃথিবীর লোকেদের নাকি শুনেছেন মাটিতেই পা। সর্বদা। ভারী অবাক কান্ড! সবাই একেবারে মা-মাটি-ইয়ে! সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রনাথ চন্দ্র বাবু শুনেছেন ওনাকে নিয়ে নাকি একমিনিটে একলিটার কবিতা নামিয়ে ফ্যালে পৃথিবীর মানুষেরা। নিন্দুকেরা অবশ্য বলে, কবিতা ওনাকে নিয়ে নয়, ওনার বৌকে নিয়ে। তা সে যাই হোক, বৌকে নিয়ে কেউ কবিতা লিখলে ওনার রাগ হবে এমন মর্কট উনি নন। বরং গর্বে ওনার বুক একেবারে গুলুগুলু করে ওঠে। বৌ যে ওনার কাব্য-ফ্রেন্ডলি, তা উনি শুভ-দৃষ্টির সময়ই বুঝে গিয়েছিলেন। চন্দ্রাহত হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। স্বয়ং সূর্য-এর সাথে যার কোলাবোরেশন, বাওয়া। প্রভাবশালী বললেও বড়ো কম বলা হয়। তাই পৃথিবীর লোকজন ভাড়াটে হিসেবে পেলে উনি বেজায় খুশি হন।
============


P.S.আজকের চাঁদ, ক্লিকড ফ্রম ছাদ।

Wednesday, 13 March 2019

নিউট্রোপিয়া


সে এক ভারী মজার দেশ। সে দেশে কেউ কাঁদে না। কেউ উচ্চস্বরে গালাগাল দেয় না। এমনকি কেউ জোরে জোরে হাসেও,  না কারণ তাতে আশেপাশের লোকজন চমকে যেতে পারে, বাচ্চা ভয় পেতে পারে, কাঁদতে পারে। এ দেশের রাস্তায়, লিফ্টে, ঘরে এমনকি বাথরুমেও ক্যামেরা। হ্যাঁ। নিরাপত্তার প্রয়োজনে। সবাই কি করছে, কি ভাবছে, কি বুঝছে, কি বুঝতে চাইছে সবটাই ওই দেশের রাজার দখলে। দেশের মানুষেরা তাই সবাই বেশ সংযত এবং নিয়ন্ত্রিত। ধর্ষণ তো দূরের কথা এখানে কারোর গায়ে টোকা মারলেই ওই এলাকা বরাবর একটা লাল আলো জ্বলে ওঠে আর সাথে সাথে ক্ষণক্ষণে একটা সাইরেন। টোকা মারা লোকটার ওপর স্পটলাইট পরে। তারপর পুলিশ এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার বিচার হয়। কাউকে ছোঁয়া এখানে সমস্যাজনক বলে এবং সর্বত্র ক্যামেরা আছে বলে বিশেষ নিয়ম যৌনতার ক্ষেত্রে। যৌনতার জন্য রেজিস্ট্রেশন করাতে হয় সরকারের কাছে এই যেমন বিয়ের জন্য করে থাকি আমরা। সেই রেজিস্ট্রেশনের সময় একটি দিন ধার্য্য হয় যেদিন তার বাড়ির ক্যামেরা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ  থাকে। বিয়ে এখানে নিষিদ্ধ। সিগারেট-মদ-গাঁজা এসব যে যেখানে যখন ইচ্ছে খেতে পারে। টিভি সিরিয়াল আর নীল ছবির প্রচুর যোগান। কারোর যদি একটু কষ্ট-কষ্ট পায় কখনো বা কি যেন নেই কি যেন নেই ভাব আসে তার জন্য আছে একটা ছোট্ট ট্যাবলেট, যা সবসময় পকেটে রাখাই নিয়ম। সেটা খেয়ে নিলেই ব্যাস, ঘুম এসে যাবে কিছুক্ষনের জন্য। আর ঘুমলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই এখানে সবসময় কিছু না কিছু করছেন আর নাহলে ঘুমোচ্ছেন। এখানে সবাই সচেতন এক একটি মেশিন। সবাই পরাধীন আর তাই সবাই সুখী। কারণ কেউ এখানে আলাদা করে ভাবে না, ভাবতে পারে না। কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না, কারণ তার যা চাই অর্থাৎ খাবার, যৌনতা, পোশাক, বাসস্থান সবই আছে বা চাইলে পাওয়া যায়। যেহেতু সবটাই নিয়মমাফিক তাই রাজা ছাড়া কেউ বেশি পেলো বা কম সেই রকম কোনো গরমিল নেই। তাই ঈর্ষাও নেই। বিয়ে নেই যে ওর বৌ বা বর বেশি সুন্দর তাই নিয়ে আক্ষেপ। তাই এই দেশকে চাইলে Sir Thomas More এর ইউটোপিয়া বলা যেতে পারে। সেই রূপকথার দেশের মতো যেখানে সবাই খুশি। বা রবি ঠাকুরের তাসের দেশ বলা যাতে পারে।
সংস্কৃতি এখানে কেউ বোঝে না কারণ তাতে ভাবনার প্রয়োজন।
কিন্তু হঠাৎ একটা পূর্ণিমা চাঁদ উঠলে কারোর মনে ভাবাবেগ এলে, কারোর যদি এই নিয়মের বাইরে যেতে ইচ্ছে করে, কারোর যদি কোনোরকম রেজিস্ট্রেশন ছাড়া এখন এই মুহূর্তে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, কারোর যদি মায়ের কোলে শুয়ে একটু ভানুর কমেডি শুনে চিৎকার করে হা হা করে হাসতে ইচ্ছে করে তাহলে? তাহলে সেটা বিদ্রোহ। তাহলে হয় তার শাস্তি হবে বা যদি বিদ্রোহ ব্যাপক মাত্রাতে হয় যখন হীরক রাজা নিজেই এসে নিজের মূর্তি ভাঙে, তখন ইউটোপিয়া ভেঙে সব আজকের মতো হয়ে যাবে।
আমরা তো সবাই ইউটোপিয়া চাই যেখানে সবাই খুশি কিন্তু তা ঠিক এইরকম আশা করিনা। সবকিছু একদম সঠিক, নিয়মমাফিক তাতে দমবন্ধ হয়ে আসে। স্বাধীনতা, এলোমেলো, ইচ্ছেমতো এসব জিনিস বড় সুস্বাদু, একবার পেলে ঠেকিয়ে রাখা মুশকিল। ওই দেশে তাই আমার আর যাওয়া হলো না। এই আমার নিউট্রোপিয়া তেই দিব্ব্যি আছি। একটা আলোর দিকে এগিয়ে চলার প্রত্যাশা নিয়েই এগিয়ে চলেছি। এই বেশ।

Thursday, 7 March 2019

তরু দত্ত

শাড়ি, পেটিকোট, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সিগারেট, বিয়ারের অলস বোতল এসব অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের মাঝে, ক্রিকেট খেলা, গাঁজা টানা যতটা মানানসই আর টানটান, মাঝে ওওওই সমাধিগুলো ততটাই বেমানান, অসঙ্গত। কেন যে আছে, কে জানে! নেহাত তাঁরা আগে থেকেই আছে, না হলে কোনোমতেই  ......
==========
২১ বছর বয়স মানে তো এই কচিটি। এই তো সবে কলেজ। এখন তো একটু খেলাধুলো করার সময়। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা টাবনা ওসবে এখন ঢের সময় বাকি।
তবে যদি কারোর জীবৎকাল হয় ২১ বছর, তাহলে?
তরুলতা দত্ত। কলকাতায় জন্ম, মৃত্যুও। মাঝে ৩ বছর ইংল্যান্ড। জীবৎকাল ২১ বছর। এরমধ্যেই ৪টি ভাষাতে ( বাংলা,ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, সংস্কৃত) পারদর্শী, লিখে ফেলেছেন দুটি নভেল। তার মধ্যে একটি Bianca or The Young Spanish Maiden ইংরিজিতে। অন্যটি Le Journal de Mademoiselle d’Arvers ফরাসিতে। বই অনুবাদ করেছেন দুটি, একটি ফরাসি থেকে ইংরিজিতে (প্রায় ৬৫ বিভিন্ন কবির কবিতা সংকলন), অন্যটি সংস্কৃত (পুরাণকাহিনী) থেকে ইংরিজিতে। জীবনের শেষ ৩ বছর নিয়মিত লিখেছেন The Bengal এবং The Calcutta Review ম্যাগাজিনে। মাইকেল মধুসুদন দত্ত এবং তরু দত্ত। পদবি ছাড়া আর একটি মিল তাঁদের। দুজনেই প্রথম ভারতীয় যাঁরা ইংরিজিতে কাব্যচর্চা করেছেন। মহিলা হিসেবে বলাই বাহুল্য ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে তরু দত্তই প্রথম, ইংল্যান্ডে যাঁর লেখার উচ্ছসিত প্রশংসা হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরেও বহুদিন। বাঙালি এই মেয়েটিকে বাংলার কিট্স্ বলা হয়।

এখন তিনি মানিকতলা ক্রিস্টান সমাধিতে। হয়তো নিশ্চিন্তেই শুয়ে আছেন, মাটির ওপরের জগৎ নিয়ে আদৌ কোনো মাথাব্যথা নেই। এদিকে মাটির ওপরের মানুষদেরও মাথাব্যথা নেই। ২১ পেরিয়ে ৪১ হয়ে গিয়েও রসগোল্লা আর পাশবালিশেই তাদের লব্ধি এবং সিদ্ধি। মাঝে মাঝে মনে হয়, তরু দত্ত একদিন সমাধি থেকে বেরিয়ে যদি নিজের কর্মকাহিনীর একটি অনুগল্প একটু শুনিয়ে যেতেন, তাঁর সমাধির ওপর ঠেক বসাতে একটু বুক তো কাঁপতো গাঁজাখোরদের। রবি ঠাকুরের বাড়িতে ছেলে মেয়েরা হাতে হাত ধরে ঘুরলে যারা "কি শিক্ষা, শেষ অবধি এখানেও  ..... " বলে মুখ ব্যাকান, রাস্তায় চুমু তো দূরের কথা একটু কাছাকাছি বসলে যাদের হার্টএট্যাক হয়, তাঁরা নিজের বাড়ির ছেলেমেয়েদের, পরিচিতদের, এমনকি নিজেকেও একটু তরু দত্তের গল্প বলুন না কেন! গর্ব করা যাক বাঙালি হিসেবে, নারী হিসেবে আর মনুষ্যজন্মলাভের স্বার্থকতার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে।
প্রণাম এই আগুনকে। ১৮৫৬এর তরু দত্তকে। 



Thursday, 21 February 2019

বাংলাভাষা ফ্রীজে রাখা রাবড়ি

বাংলাভাষা ফ্রীজে রাখা রাবড়ির মতো, চরম শান্তি এই ভেবে, যে সে আছে, জানি সাথে আছে, এক্কেবারে আমার। এ স্বাদের ভাগ হলে স্বাদ সাড়ে সাতাশ গুন বাড়ে। পাস্তা-কাবাব-নিজামের রোল জিভ-এর সারপ্রাইস গিফ্ট। কিন্তু আদতে জিভের যে অপেক্ষা, বাংলাভাষা তাই। সবাই জানে। কিন্তু বাড়িতে মায়ের আদরের মতো ওটা কিরকম একটা "আছেই তো" টাইপের হয়ে যায়। একবার বাংলার বাইরে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে নিলেই,, এসিডিটিটা অনুভব করা যায়। তখন কো-বাঙালি খুঁজে অক্সিজেন টানার চেষ্টা চলে।
**মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বসে খেলার ম্যাচের ওই নির্ণায়ক মুহূর্তে, হাত কচলানোর সময় আপনার মুখ দেখে যে কেউ বলবে, আপনি হাওড়া।
**প্যারিসের পকেট ফাঁকা করা হোটেলে ঢুকে যখন দেখলেন, পাশবালিশ নেই, দুটো গালাগাল বেরোনো বাঙালি অধিকার।
**স্প্যানিশ প্রতিবেশীর গিটার প্র্যাকটিস বেশ লাগে, একদিন সেই সুরে রবি ঠাকুর পেতেই প্রথম গিয়ে আলাপ করলেন।
**পোল্যান্ডের গ্রামে বাঙালি রেস্তোরাঁ নেই, শুধু বাড়ির খাবার পেতে আপনি বিয়ে করলেন।
**আইসল্যান্ডে পৌঁছে অব্দি বাঙালি মুখ খুঁজছেন, যদি একটিবার পাওয়া যেত।
**ঠান্ডা রুমে ঢুকে রুম হিটার অন করতে করতে বুকের ভিতর থেকে দলা পাকানো কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা তাকে আটকানোর। কি মুখে কাঁদবেন? মায়ের "খেয়ে নে" ঘ্যানঘ্যানানি আর প্যাঁচপ্যাঁচে গরম থেকে পালাতেই তো এদেশে।
আরও হাজারো হাজারো অনুভূতি চারিদিকে। বাংলা শুধু ভাষা নয়. প্রতি শব্দে রয়েছে একটা একটা অভিব্যক্তি। ভূল হোক বাংলা লিখতে, হাজার বাংলার মধ্যে দুটো ইংরিজি আসুক। মন জানে বাংলা কি। মন সব জানে বাংলা আমার কাছে কি।

Thursday, 14 February 2019

আয়না, আই লাভ ইউ

আদো আদো করে গড়িয়াহাটের মোড়ে দাঁড়িয়ে তারা আজ প্রমিস করলো, কখনো ছেড়ে যাবে না একে অপরকে।
আজ থেকে তারা মনে-প্রাণে এক।
অটোতে বাড়ি ফেরার পথে, মেয়েটি দেখলো, ছেলেটি হা করে রাস্তার ওপারে অন্য একটি মেয়েকে দেখছে। এমন তন্ময়, যে তাকে হাত নেড়ে "বাই" বলতেও ভুলে গিয়েছে।
ছেলেটি এক্সপেক্ট করছিলো, বাড়ি ফিরে মেয়েটি জানাবে, ছেলেটির দেওয়া গিফ্টটা কেমন লাগলো। কিন্তু মেয়েটি জানায়নি।
তারপর রাতে ফোনে কি প্রচন্ড ঝামেলা! দুজনেই রাগে গুমরোচ্ছে। বিছানাতে এপাশ-ওপাশ, দুশ্চিন্তা। পরের দিন মিটমাট হবে কিনা জানা নেই। গড়িয়াহাটের প্রমিসটা জাস্ট ছেলেখেলা মনে হচ্ছে। একটা রাত চলে যাবে চিন্তায়, মন খারাপে। একটা পুরো রাত। ধুস।
হঠাৎ কি মনে হলো, তখন মাঝরাত, মেয়েটি আয়নার কাছে গেলো, নিজেকে দেখলো আর কি জানি কি মনে হলো, কারিনা কাপুর স্টাইলে বললো,"মেয় আপনি ফেভারিট হু". আর বলেই হেসে ফেললো। আর পরক্ষনেই রাগটাগ ভ্যানিস। জাস্ট সু, ভ্যানিশ। ইশ, রাগটা কি বিচ্ছিরি রকমের বাড়াবাড়ি লাগছে এখন।
কেউ কতদিন কাকে কত কিলোগ্রাম ভালোবাসবে, তা কি সে নিজেও জানে! প্রমিস-ট্রমিস তো শুধুই মুহূর্তকে গ্ল্যামারাস করার মেকআপ কিট। একজনের প্রতি অপরজনের ভালোবাসা থাকলে থাকে। না থাকলে থাকে না। ভালোবাসা আসে, যায়, হয়তো আবার আসে।
রবি ঠাকুর বলেছেন,"
লাজে ভয়ে ত্রাসে আধো-বিশ্বাসে
শুধু আধখানি ভালোবাসা,
শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,
শুধু আলো-আঁধারে কাঁদা-হাসা।"
কেউ ছেড়ে যাবে তার ভয়, কেউ যদি আর ভালো না বাসে তার ভয়, কেউ চিট করছে কি না তার ভয়! এই ভয় যাকে বলে ইনসেক্যুরিটি, চব্বিশঘন্টা চেপে থাকবে কেন! কেন কারো জন্য নির্ভর করবে নিজের ভালো থাকা! কেউ কাউকে কি বা দিতে পারে! কাকে কত লিটার বিশ্বাস করা যায়! এর উত্তর কি কেউ জানে?
কিন্তু নিজেকে ভালোবাসার গ্যারান্টিটা তো নিজেই দেওয়া যায়। তাতে না কাউকে দরকার, না কেউ বাধা। বরং নিজেকে ভালোবাসলে মনের মধ্যে একটা হনলুলুকুলুপুলু টাইপ তৈরী হয়, তাতে বাকি সব কিছু "বেশ তো" টাইপ হয়ে যায়। বেশ একটা ক্ষমা-মা ভাব আসে।
মেয়েটি সেদিন রাতে এসএমএস করলো,"আই লাভ ইউ, বাট মোর আই লাভ মাইসেলফ। এন্ড, আই এম হ্যাপি"। সে রাতটা দুজনেই নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেলো। ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে কোনো গ্রাজ নেই, কারোর ওপর কোনো রাগ নেই। ঠিক যেমনটা সবাই চাই। শান্তি।
তাই কাউকে ভালোবাসা ভালো। তার চেয়ে ভালো একটা আয়না আর তাকে বলা আই লাভ ইউ। নিজেকে ভালোবাসলে বাকিদের থেকে চাওয়ার ক্যালকুলেশনে ব্যস্ত থাকার দরকারই হয়না। ট্রাই, ইট ওয়ার্কস।