Friday, 27 March 2020

তাইজিতু

দেখলাম এক বন্ধুস্ত্রী হাতে একটি ট্যাটু করিয়েছেন। একটি প্রতীকী। জিজ্ঞেস করাতে একটু খাবি খেলেন। বললেন, ও ওই ওই আর কি, ওই মানে ব্যাপারটা কুল, তাই আর কি  ......
তা "কুল"র টেস্ট সবসময়ই ভালো। সরস্বতী পুজোর পর তা একটু বরং বেশি। তাই টেস্ট করতে একটু খোঁজাখুঁজি করেই ওই "কুল" প্রতীকীটির ব্যাপারে জানা গেলো।
কাকতালীয় ব্যাপার মশাই, আজ যখন চীনে ব্যাপার নিয়ে সারা পৃথিবী বেশ সরগরম, প্রতীকটিও চিনে। চীনা ঐতিহ্যবাহী ‘তাইজিতু’ (Taijitu) প্রতীক (ছবি সাঁটানো)। এই প্রতীকের একপাশ অন্ধকার বা কালো (ইন), অন্য পাশ আলোকিত বা সাদা (ইয়াং)।
"ইন" আর "ইয়াং" এর কথা নিয়ে কোটি লেখা থিক থিক করছে ই-জগতে। ছোট করে বলতে গেলে, চাইনিস "টাও" ফিলোসফি মতে,  ইন মানে মুন, ইয়াং মানে সান। ইন মানে ঢাকা, ইয়াং মানে খোলা। ইন মানে মহিলা, ইয়াং মানে পুরুষ। আর উভয় মিলেই এই ইউনিভার্স। একে অপরকে ছাড়া কিছুই নয়। খুবই জানা তথ্য। নতুন কিছু নয়। অর্ধনারীশ্বর কনসেপ্ট তো আমাদের ঘরের। এ নিয়ে সবাই আমরা সুজ্ঞানী। কেউ বলতে বললেই চার নম্বরের সারাংশ নেমে যাবে চোখের পলকে। হোঁচট খেলাম যখন আরও পড়ছি আর বুঝছি চাইনিস মত অনুযায়ী ইন মানে নেগেটিভ, আর ইয়াং মানে পসিটিভ। ইন মানে প্যাসিভ, অন্ধকার, কালো আর ইয়াং মানে একটিভ, আলো মানে সওওওওওব ভালো। ইউনিভার্সের সাদা কালো, অন্ধকার আলোর কন্সেপ্টে মহিলাদের ওই অন্ধকারের সাথে যোগে আমার বড় ধাঁধা।মহিলাদের নেগেটিভ বলে যে মহান কান্ড চাইনিস এনসেস্টররা করেছেন, আজকের চাইনিসরা তার প্রতিবাদ করেন যদিও। তারা জেন্ডার ইকুয়ালিটিতে বিশ্বাস করেন। তথাপি মধ্যযুগীয় কাল থেকে মহিলাদের এই যে নঞর্থক ভাবার প্রবণতা তা অন্য দেশেও স্পষ্ট। ১৪ থেকে ১৮ শতকে মহিলাদের দ্বারা কোনো ব্যাভিচারের অভিযোগ আসলে, শাস্তি হিসেবে আবিষ্কার হয়েছিল এক যন্ত্র যাকে "ব্রেস্ট রিপার" বলে (ছবি সাঁটানো)। এই যন্ত্র দিয়ে তাদের ব্রেস্ট ছিড়ে নেওয়া হতো। নানা এক্সপেরিমেন্ট এও দেখা গেছে, সুযোগ পেলে শান্ত নিরীহ পুরুষও মহিলাদের শরীরের সুযোগ নিয়েছেন। শেক্সপীয়ারের গল্প অনুযায়ী,  শ্রীউ বলে অবিহিত করা হতো স্পষ্টভাষী মহিলাদের, যাদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক চোখে দেখা হতো। এথেন্সে ডেমোক্রেসি শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, তবু মহিলাদের মা হিসেবে দেখাই অর্থাৎ সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং তাদের লালন করাই একমাত্র কাজ বলে মনে করা হতো। ঋগ্বেদ যুগ বাদ দিলে ভারতবর্ষে মহিলাদের ইনইকুইলিটিও সবারই জানা।
যদিও আজ চিত্র অন্য। তার জন্য পুরুষদের সুচেতনাকে ধন্যবাদ।

কিন্তু কথা হলো, বন্ধুস্ত্রী, যিনি এই প্রতীকটিকে বহন করে চলেছেন, তাকে নিয়ে আমার বড়ো দুশ্চিন্তা। কুল দেখাতে গিয়ে মস্ত ভুল করেননি তো?





Tuesday, 18 February 2020

ডেথ ড্রাইভ

ধরে আছে? নাকি ছেড়ে দিতে চাইছে?
এসব ভাববো না কল করবো পুলিশ? ইমিডিয়েট হেল্প?
বেশ কিছু লোকও ততক্ষনে জড়ো হয়েছে আসে পাশে। সবাই হা করে ওপরে তাকিয়ে। সবার মুখে ভয় আতঙ্ক। এদিক ওদিক দেখছেন। কেউ কি কল করেছে অলরেডি পুলিশে? হেল্প কি আসছে? কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, হেই। আর ইউ ক্রেজি? হোল্ড অন। ডোন্ট ডোন্ট ডোন্ট ডু দিস ম্যান। একজন বয়স্ক মহিলা বিড়বিড় করছেন। বোধহয় ঈশ্বরকে ডাকছেন।
হঠাৎ একজন হেসে উঠলো। সাথে সাথে একটা চাপা হিসহিস, ফিসফিস। আর ছোঁয়াচে হাসি একটু একটু করে সবাইকে কব্জা করলো। আরে ফাইবারগ্লাসের একটা স্ট্যাচু যে।
আজ্ঞে। চেকরিপাব্লিকের প্রাগ শহরের স্টেয়ার মেস্তো অর্থাৎ ওল্ড টাউনে এই স্ট্যাচুটি আসলে ট্যুরিস্টদের জন্য একটা চমক।
----------------------------------------------------------------------------------------------
সিগমান্ড ফ্রেউড ছিলেন একজন সাইকোএনালিস্ট। সাইকোএনালিসিস্ শব্দটির জন্মদাতা এই ব্যক্তি নানা চিকিত্সাবিদ্যাগত আবিষ্কার করেছেন মানুষের সাইকিক নেচারের নানা ক্ষেত্রে যেমন বিষাদ, ইগো, স্বপ্ন এমনকি থানাটোস অর্থাৎ মৃত্যুর চালক ইত্যাদিতে। নিউরোলজিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রায় আশি বছর বয়সে তিনি যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে, তখন তাঁর খ্যাতি এবং জন্মসূত্রে ইহুদি সংযোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মানসিক-শারীরিক অত্যাচার সহ্য করেন। তাঁর নিজের লেখা মূল্যবান তথ্য পুড়িয়ে দেওয়া হয় চোখের সামনে। নিরুপায় হয়েই পালিয়ে যেতে হয় লন্ডনে। শেষের সে দিন তখন ভয়ঙ্কর রিফুজি অবস্থায় কাটছে যখন, ধরা পড়লো ক্যান্সার বীজ শরীরে জাঁকিয়ে বসেছে। সমস্তটা জীবনে নানা মানুষের আতঙ্ক, সাবকন্সসিয়াস মানসিক অবস্থা নিয়ে এনালাইসিস করা ব্যক্তি নিজেও ভয় পেয়েছেন বহুবার নিজেকে নিয়ে। আতঙ্কে থেকেছেন। মনে হয়েছে জীবনকে ধরে রাখবেন নাকি হাল ছেড়ে দেবেন। শেষে যখন অসুস্থতা চরমে, খাওয়া বন্ধ হলো, কথা বলাও, নিজের মৃত্যুর ভয়ে প্রতিদিন মরছিলেন পলে পলে। সিদ্ধান্ত নিলেন মরফিনের হাই ডোসে মৃত্যুবরণ করবেন তাঁর ডাক্তার বন্ধুর সাহায্যে। হলোও তাই। প্ল্যান মাফিক কাজ।

প্রাগের মূর্তিটি তাঁর ওই মানসিক অবস্থাকে উৎসর্গ করেই, ধরে রাখবেন নাকি জাস্ট ছেড়ে দেবেন!

Saturday, 25 January 2020

পার্কসার্কাসের সার্কাস

হুন্ডাই থেকে হন্ডা মেয়ে টানে বেশি। অভীক এর প্রতিটি উইকেন্ড হন্ডা কেনার পর থেকে জব্বর কাটছে। কলেজের সিনিয়র - জুনিয়র এরা তো ছিলই। এখন সানন্দার কভার মডেলরাও ইসি। আর তাছাড়া আজকাল সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আনসোশাল হওয়াটা অনেক বেশ সহজ। তার ওপর বিংশ শতাব্দীর সুবিধা হলো, ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের কথা বলে গাড়িতে ডাকতে হয় না। হন্ডা, আর সাথে সমপ্লেসএলসের অফার পেলেই ব্যাপারটা স্মুথ। গাড়ির কাঁচে ব্ল্যাক ফিল্ম লাগানোটা বেআইনি। অভীক এর তাতেই ডেয়ারিং হওয়ার এডভেঞ্চার। ফিল্ম লাগানো কাঁচের গাড়ি থাকলে, বাইরের লোকজন ভিতরের কিছু দেখতে পায় না। তাতে বান্ধবীকে বাড়িতে ডেকে এনে ঝামেলা বাড়ানোর চাপ নেই। জীবনে ফ্লেক্সিবিলিটি খুব দরকার। এই যুগের ছেলেমেয়েরা সবাই খুব ফ্লেক্সিবল। সরস্বতী পুজোর পর কুল খাওয়া দিন গন। এখন সবাই "কুল"। তাতে মাঝে মাঝে এক দুটো ভুল হয় বটে। কিন্তু সেসব ভেবে উইকেন্ড খারাপ করা যায় না। এরকম বেশ কয়েকটা উইকেন্ড কুল অভীক, কুল মোনালিসার সাথে কোলাকুলি কাটিয়ে নেওয়ার পর, যখন পাশ কাটিয়ে সোনা আর লিসাদের দিকে ঝুঁকছে, মোনালিসা এ জিনিস মেনে নিতে পারছে না। কুল হতে গিয়ে ইমোশনাল ভুল হয়ে গেছে। এইখানে হয়ে যায় সমস্যা। ফ্লেক্সিবিলিটির মজা নিতে নিতে আজকের সোনা-মনারা ভুলে যায় যে বেশি টানাটানি করলে ফ্লেক্সিবিলিটি টুং করে ছিঁড়ে যেতে পারে, অন্তত সম্ভাবনা থেকেই যায়। অনুনয়, বিনয়, আবেগ, ভালোবাসা, মোহ আর নানা রকম হাতিয়ারেও কাজ না হতে মোনালিসা প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকে। তাতে অভীকের কিছু যায় আসে নি।
মোনালিসার ভাই কয়েকটা উইকেন্ড অভীককে ফলো করে দেখে নিয়েছে উইকেন্ডে হন্ডা কোথায় কোথায় যায়। গাড়ি চাঁদনীচক থেকে পার্কস্ট্রিট আসে। সেখান থেকে "জলযোগ" হয় তারপর পার্কসার্কাসে গাড়ি বেশ কিছুক্ষন দাঁড়ায়।
থার্টি ফার্স্ট। গাড়ি আজ অনেক বেশি চনমনে। হন্ডা গ্যারাজ থেকে এসেছে আজই আরও ধোপদুরস্ত হয়ে নতুন চকচকে রঙে। বান্ধবীর সাথে অভীকের এক্সসাইটমেন্টের লেভেলটাই আজ মধ্যগগনে। গাড়ি চাঁদনীচক, পার্কস্ট্রিট হয়ে এখন পার্কসার্কাসে দাঁড়িয়েছে দশমিনিট। আশেপাশের লোকজন একটু বেশিই দেখছে আজ গাড়িটাকে।
ঠোঁটে চুমু, বিয়ারে চুমু, নেশা তখন টানটান। গাড়িতে নক, হালকা তারপর জোড়ে, ভীষণ জোড়ে, ভীষণ রকম জোড়ে। পুলিশ।
========
অভীক এখন পুলিশের কাস্টডিতে। নাঃ গাড়ির কাঁচে ব্ল্যাক ফিল্ম লাগানো ছিল বলে নয়। ইনফ্যাক্ট অভিকের গাড়ি কয়েকদিন যে গ্যারাজে ছিল, মোনালিসার ভাই সেখানে গিয়ে ব্ল্যাক ফিল্ম সরিয়ে দিতে বলেছিল। এক্সসাইটমেন্টে অভীক বোধহয় তা খেয়াল করেনি।

Monday, 6 January 2020

স্টিমুলেশন

হাওড়ার অলিগলি ঘোরার শেষে এবার একটা গপ্পো তৈরী হয়েছে বোধ হচ্ছে।
বোটানিক গার্ডেন সোমবার বন্ধ। স্বাভাবিক। মানুষ কাজকর্ম করে। জ্যাঠামশাই সে বহু দূর দেশ এদেশে এসেছেন। সোম মঙ্গল মানছেন না। কলকাতার সব কিছুকে একেবারে চেখে নিতে চাইছেন প্রতিটি মুহূর্তএ। তা তার সোমবার কলকাতা চাখার ইচ্ছে হলেও, বাগান দেখার ইচ্ছে হলেও বাগানের মালিকের তো নিয়ম আছে। সোমবার বাগানে ঘোরা সাজে না। বাগানের সামনে গিয়ে সিকিউরিটির লাঠির ভয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি উপায়ান্তর গন্তব্য ভাবতে হবে। স্টিমুলেশন চাই। কচুরি-আলুর বিকল্প নাই। কচুরির দোকানে পৌঁছনো গেলো।
কথায় কথায় জ্যাঠামশাই বললেন, হাওড়া আন্দুলে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে এসেছিলেন এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধু তখন রাজনীতি করেন। জ্যাঠামশাই ডাক্তারি পড়া শেষ করে প্র্যাক্টিসের চেষ্টা করছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাইএর কাটানো গল্প বলতে শুরু করলেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই রাতবিরেতে ট্যাংরাতে চ্যাংড়ামো করেছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই শ্রীহরির সকালবেলার প্রথম কাগজের ঠোঙার কচুরি খেয়েছেন সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই আরেকবন্ধুর বাড়ি গিয়ে বিকেল থেকে রাত অব্দি বন্ধুর মা কে বুঝিয়ে বন্ধুর বিয়ে দিতে রাজি করিয়েছেন। সে বন্ধুর সাথে জ্যাঠামশাই-এর শেষ দেখা চল্লিশ বছর আগে। ফোন নম্বর বদলেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আজ তাকে জ্যাঠামশাইএর মনে পড়েছে ভীষণ। এইটুকু শুনতেই আমি তাকালাম জ্যাঠামশাইএর দিকে আর জ্যাঠামশাই? আমার দিকে। হেসে বললেন, "বলছিস?" বললাম, "নিশ্চই, বাগানে যখন তালা ...... চলো খুঁজেই দেখি, আফসোস বড়ো ভয়ানক জিনিস, চেষ্টাটা তো হোক"।
প্রতি এক কিলোমিটার অন্তর চায়ের দোকান, টায়ার দোকান, হোমিওপ্যাথি সর্বত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের প্রশ্ন, "আকাশ ভট্টাচার্য? রাজনীতি করতো? এই সোজা গিয়ে ডান দিকে কোথাও ..... বাবার প্রস্টেট ক্যান্সার হয়েছিল, বয়স সত্তর হবে। চেনেন?" আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রায় সবাই বললেন,"আকাশ? ভট্টাচার্য? দাদা পাড়ার নাম বলুন। ধুস। এভাবে হয় নাকি?" খুব বুদ্ধিমান একজন বললেন,"ফোন নম্বর আছে?" উনি বোধহয় ভেবেছেন আমাদের ফোন নেই। এসটিডি বুথ খুঁজছি।
প্রায় দুঘন্টা সারা রাস্তাতে বুলি পড়ার শেষে আমরা বুঝলাম চেষ্টারও সীমা থাকে। ওই সামনের চায়ের দোকানই সেই সীমা। চা খাই আর যদি খবর না পাই তাহলে এখানেই এ গল্পের শেষ। চা খাচ্ছি আর চা ওয়ালা আমাদের কান্ড শুনছেন। হঠাৎ চিৎকার করে ডাকলেন কাউকে। স্কুটারে বসা এক লোক এলেন, সবটা শুনলেন আর বললেন, "চা খেয়ে আসুন আমার সাথে"। জ্যাঠামশাই এর চোখ চকচক করে উঠলো। চা আর কে শেষ করে তখন! পাঁচ সেকেন্ডে ক্লাচে পা। স্কুটারের পিছন পিছন আমরা চললাম। বাম্পারে আর কোমড়ে তখন যুদ্ধ। স্কুটারওয়ালা কিছু দূরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু লোক জড়ো করেছেন। তাঁরা এলেন আমাদের কাছে। আমরা আবার বুলি পড়লাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁরা বললেন," অমুক জায়গায় যান। কিছু খোঁজ মিলতে পারে।" আবার স্কুটার আর তার পিছন পিছন আমরা। সোমবার যেখানে বাগান বন্ধ, এই স্কুটারওয়ালা যে ভাবে আমাদের সময় দিচ্ছেন তা দেখে আমাদের মনে হলো, বন্ধুর দেখা না পেলেও মানবিকতার এই যে দৃষ্টান্ত পাওয়া, কিছু অংশে কম নয়। পিছন পিছন আমরা চললাম। এখানেও দেখা মিললো না। চললাম ডান দিকে। তারপর বাঁ। নাহ। মিলছে না। আমরা হাল ছেড়েছি। কিন্তু স্কুটার ব্যক্তি ছাড়েননি। এক স্থানীয় ব্যক্তির বাড়ি যাওয়ার উদ্যেশ্যে ঢুকেছি যে রাস্তাতে সেখানে চারজন পাশাপাশি গেলেই মেলা তৈরী হয়। সেরকম রাস্তাতে বড়ো ছোটো নানা গাড়ি, মানুষ, কুকুর, বিড়াল, কাক, ঢালা পিচ, গালাগালি আর হর্ন। যাকে বলে জমে ক্ষীর। কোনোরকমে ঢুকছি। আতঙ্কএ বুক দুরুদুরু, এ গলি থেকে বেড়োবো কিভাবে! এ গলিতে ইউ টার্ন নিতে পারেন একমাত্র রজনীকান্ত। অভিমন্যু ফিলিং নিয়ে এগোচ্ছি। ভদ্রলোক দাঁড়াতে বললেন। আমরা দাঁড়ালাম। পাঁচ মিনিট পড়ে ভদ্রলোক দৌড়ে এক গাল হেসে গাড়ির কাঁচের কাছে এসে বললেন, "বেরিয়ে আসুন। পেয়েছি"।
-হ্যা? বলেন কি? পেয়েছি মানে?
-হে হে পেয়েছি। আকাশবাবুর দাদা এনার বন্ধু। বহু পুরোনো বাসিন্দা এনারা। ইনিও রাজনীতি করতেন। তাই যোগাযোগ .....

তারপর বনেদি বাড়ির মুড়ি-চা, দুপুরের খাওয়ার ইনভিটেশন, আকাশবাবুর ছেলের হন্তদন্ত হয়ে আসা, আমাদের দেখে "এও সম্ভব" জাতীয় মুহূর্তের হা হওয়া, আমাদের তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, আকাশবাবুর জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরা, দুজনের আমাকে পাগলের মতো পুরোনো গল্প শেয়ার করা, স্কুটারওয়ালার চোখের কোণে জলের চিকচিক, আরও কত কি।

আমার চোখের সামনে আকাশ-বাতাস-সময়-মানুষ-ইমোশন সবাই মিলে একটা গপ্পো তৈরী করলো বটে।

Thursday, 5 December 2019

তার আগে আসুক কম্পাস

পুজোর সময় থেকেই চারিদিকে পোস্টার "উত্তর আসবেই"। ছোটমামা গম্ভীর মুখে বলেছিলো,"তা আসুক কিন্তু তার আগে প্রশ্ন আসুক, আর তার আগে আসুক মালপোয়া"। বলেই একটা মালপোয়া এক সেকেন্ডে গপাৎ।
তা প্রশ্ন আসেনি তবে পোস্টার বদলে নতুন পোস্টার এলো,"পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ, উত্তর আসবেই"। ছোটমামা গম্ভীর মুখে বলেছিলো,"তা আসুক, তবে তার আগে আসুক কম্পাস"।
রাজর্ষি দে র নতুন ছবি পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ, উত্তর আসবেই । চলন্ত একটা ট্রেনে যাত্রী অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় ও কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। হঠাৎ অর্পিতাকে কোনও একটা গল্প শোনার জন্য জোরাজুরি কমলেশ্বরবাবুর। আমার বিশ্বাস ফাঁকা কামরা থাকলেও উনি গল্প বলতেন নিশ্চিত। প্রতিবেশী বয়স্কা যাত্রীটি ডায়ালগ ডেলিভারির দায়িত্ব সুন্দর পালন করেছেন। টানা বলে গেছেন। সামনের কারোর কথা শোনার বা বোঝাবার অবকাশ দেননি। এবং বক্তব্য শেষ করেই ধা হয়েছেন। ঠিক আমার এক দিদার মতো। তিনি অবশ্য কানে শোনেন না। যাই হোক, কমলেশ্বরবাবু গল্প শুরু করেন। তিনটি গল্প বলেন। গল্পের মাঝে মাঝে অর্পিতাও থেকে থেকে নিজের জীবনের কথা বলতে থাকেন, তা সে গল্পের সাথে যোগাযোগ থাকুক বা না থাকুক। কমলেশ্বরবাবুর তিনটি গল্পের প্রতিটিতেই ভীষণ রকম তাড়াহুড়ো। প্রথম গল্পটি শেষ হয়ে গেলো বোঝা গেলো যখন দ্বিতীয় গল্প শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় গল্পটিতে এক ভদ্রমহিলা পুরো গল্পটা জুড়েই ছিলেন। "মেয়ে বাড়ি এসেছে" থেকে "মেয়ে পালিয়ে গেছে" বরাবর তার এক অভিব্যক্তি। এ ধরণের চারিত্রিক গুণধারী মানুষের বাস্তবজীবনে আশেপাশে থাকা অত্যন্ত জরুরি। "জীবন মানেই মায়া" গোছের ভাব আসে, দুঃখ কষ্ট স্পর্শ করে সে সাধ্য কার। এ ছাড়াও দ্বিতীয় গল্পটিতে আবার সেই তাড়াহুড়ো। দুষ্টের দুষ্টামি যত না রসিয়ে কষিয়ে দেখানো হলো, দুষ্টের দমন হলো পাঁচ সেকেন্ডে। কাট টু তৃতীয় গল্প। তৃতীয় গল্পটি আগে থেকে না পড়া থাকলে "বোধহয় অমুক, বোধহয় তমুক" টাইপ অনুমানের ওপর ভরসা করতে হবে। আর বাকি সব ভুতুড়ে বাংলা সিনেমার মতো এতেও ভূত অদ্ভুত হাঁটে, অদ্ভুত কথা বলে, অথচ আশেপাশের লোক তাদের সাধারণ মানুষ হিসেবেই ঠাওর করে। কি বোকা! এত্ত গপ্পো হলো  তাতে লাভের লাভ এই যে কমলেশ্বরবাবু গল্প বলার জাদুতে অর্পিতা যথেষ্ট ইমপ্রেসড হন এবং ডিরেক্টর সুযোগের অপব্যবহার না করে তাদের প্রেমের সম্পর্ক-এ  আবদ্ধ করেন। পাবলিক শুরুর দিকে ঘেটে ঘ হলেও শেষে মাখোমাখো প্রেম দেখে চিপসের প্যাকেট সিটের তলায় গুঁজে বেরিয়ে পড়েন।
গল্প এক্সেকিউশন ঝুলে গেলে যে জিনিসটা সারভাইভাল ফ্যাক্টর হিসেবে বেঁচে থাকে তা হলো, কিছু বাঘা অভিনয়। পরানবাবু, রুদ্রপ্রসাদ বাবু, রাজেশ শর্মা, বিদীপ্তা, পদ্মনাভ সাথে গৌরব আর দামিনী বেণী বসু(আসল নাম জানি না) দুঘন্টা জমিয়ে দিয়েছেন।
শেষে, কিসের উত্তর খুঁজতে ঢুকলাম বা কিসের উত্তর পেলাম সেটাই প্রশ্ন হয়ে রইলো। ছোটমামা গম্ভীর মুখে বলেছিলো,"প্রশ্ন আসবেই"।

P.S.ব্যাগে যা নিয়ে এলাম, আগমবাগীশকে আরো বেশি করে জানার আগ্রহ।



Saturday, 7 September 2019

হ্যান্ডওভার

- হ্যালো
- হ্যা হ্যাল্লো হ্যাল্লো মিস্টার দাশ, তন্ময় বলছি।
- হ্যা হ্যা বলুন। কেমন আছেন? অফিসের সব কেমন লাগছে? নতুন কেবিন? সব ঠিক তো?
- একটা গোলমাল বুঝলেন
- কিরকম গোলমাল? হ্যান্ডওভারের সব কাগজপত্র বুঝিয়ে দিলাম যে।
- লেবু চা টা কোথা থেকে আসে বলুন তো?
- মানে?
- মানে রোজ বিকেলে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ক্যান্টিন থেকে কেউ পাঠায় না বললো।
- ওহ! লেবু চা? হা হা, আসলে আমি তো রোজ ওই সময়ে খেতাম, তাই বোধহয় অভ্যেস বশে রাস্তার পাশের চা ওয়ালাটা দিয়ে গিয়েছে।
- গত ৩ সপ্তাহের প্রতিটি দিন উইথাউট মিস। আমি চাওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা না বললো। কে দিয়ে যায় দেখতে পাইনা। শুধু দেখি বিকেলে ওই সময়ে চা টা টেবিলে।
- স্ট্রেঞ্জ। আমি তো কিছু  ....
- আর ওয়ালক্লক টা দশ মিনিট ফাস্ট। ম্যানেজার বাবু বললেন, আপনি নাকি করে রাখতেন ওরকম।
- হ্যাঁ তা বটে।
- আমি কারেক্ট টাইম করালাম, কিন্তু পরেরদিন যেই কে সেই।
- বটে, নতুন ঘড়ি ট্রাই করে দেখ  .....
- দেখেছি। যে কে সেই।
- সেকি।
- শুধু তাই নয়, ভাঙা সবুজ পেপারওয়েটটা কিছুতেই টেবিলের ওপর থেকে নড়ছে না। পাঁচটা নাগাদ জানলার শেডটা আপনাআপনি নেমে আসছে। সবই ঠিক আপনার অভ্যেস মতো তাই না?
- হ্যাঁ কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা, আমি তো এখন আর ওই কেবিনে নেই। যাই নি গত ৩ সপ্তাহ।
- কিন্তু গত তিরিশ বছর আপনি ছিলেন, এই কেবিনে। এই অভ্যেসগুলোর সাথেই। ওদের নিয়েই। আপনি ওদের ছেড়ে গিয়েছেন। ওরা ছাড়তে পারেনি।
- হ্যান্ডওভার  .....
- কি শুধুই কাগজের আর দায়িত্বের? অভ্যেসের হ্যান্ডওভার হয়নি মিস্টার দাশ।

Wednesday, 31 July 2019

গটরি অমাবস্যা

বাঙালিরা ডিম, ডিমের কুসুম, মটনের চর্বি থালার কোণায় রেখে দেয়। হিমালয় ঢেকে দেওয়া ভাত, কোপাই নদীর মতো তরকারিতে না কুলোলে, তবু কুতিয়ে কাতিয়েই শেষ করা যায়, কিন্তু ওই স্বর্গীয় বস্তুসমস্ত শেষপাতেই, জমিয়ে এবং অবশ্যই রসিয়ে। ভাগ্গ্যিস আজকাল বিয়ে বাড়িতে বুফে সিস্টেম। নাহলে আইসক্রিমের পর চর্বিওয়ালা ওয়ান পিস্ চাইতে ক্যাটারারদের সামনে হাত পাতা ইস লিটল ইয়ে ইয়ে। মোদ্দাকথা বাঙালি ভালোবাসার জিনিসটি যত্নে সামলায় শেষ পাতে।
তেমনি কালী পুজোর নির্জলা উপবাস। দুদিন আগে থেকেই বাড়িতে নিরামিষ। দিনের দিন তো চোখে মুখেই নিরামিষ ভাব ফুটে ওঠে। লোকজন দেখলেই বোঝে কিছু মর্মান্তিক ঘটেছে। নিরামিষকে আপন করতে পারার থেকে কঠিন আমিষকে দূর করা। আর যেই কালী পুজো শেষ, সকালে উঠেই বাঙালির প্রথম শব্দ, মটন। কালী পুজোর সাথে পাঠাবলির পিছনে কোনো প্রবল খাদ্যরসিক ব্রাহ্মণের যোগাযোগ না থাকলেই নয়।

মারাঠিরা অর্থাৎ মহারাষ্ট্রিয়ানরা উল্টো। শ্রাবণ মাস এ তাঁরা একবেলা খায়, নিঃসন্দেহে নিরামিষ। মদ্যপান? ছিঃ। তাঁরা মনে করে, এই সময় চারিদিকে রোগের সম্ভাবনা বেশি, তাই ভোগের লোভ আয়ত্তে রাখাই যথাযথ। তাই শ্রাবণ শুরুর আগের দিনই তাঁরা গাঁতিয়ে খায়, একে গাতারি বলে। গাতারি অমাবস্যা মানে শ্রাবণের আগের অমাবস্যার দিন। লোকমুখে প্রচারিত ঐদিন লোকজন মদ খেতে খেতে টলে পড়ে নালাতে, তাই এর নাম গটরি অমাবস্যা। চিকেন আর মদ ঐদিন অপরিহার্য। অন্যরকম ভ্যারাইটি স্বাদমতো, জিভমতো, মনমতো, পকেটমতো।



আগামী ০২ অগাস্ট সেই গাঁতিয়ে খাবার দিন। অদ্ভুতভাবে সেদিন আবার শুক্কুরবার। মহারাষ্ট্রে থাকলে তো কথাই নেই, না থাকলেও সেক্যুলার কসমোপলিটন বাঙালি হিসেবে দিনটি উদযাপন করা কর্তব্য। কি বলুন?