Wednesday, 22 March 2017

জীবন মানেই জিবাংলা 2

রসিকবাবু হনিমুনে। না মানে একটু খাঁদমিশ্রিত হনিমুনে।
যৌথ পরিবারে আর হনিমুন! কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেই মিনিমাম সতেরোজন সঙ্গে সঙ্গে তল্পিতল্পা নিয়ে রেডি। তাই আপিসের কাজে উড়িষ্যা যেতে হবে শুনে অফারটা বাগিয়ে নিলেন রসিকবাবু। এব্রিথিং ইস ফেয়ার ইন লাভ। আর ওয়ার নিয়ে শান্তপ্রিয় রসিকবাবুর কোনো কাজ নেই। পাতের পেঁপের মতো জীবনের থালা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
রসিকবাবু এসে হাজির উড়িষ্যায়। কথামতো গিন্নিও বাপের-বাড়ি-যাবে অজুহাতে, সাথে সাথে। সব একদম মাখনের মতো হলো।
বাড়ি থেকে কেউ একটিবারও ট্যাফোঁ করতে পারেনি। ইয়াহুহুহুহুহুহু। অফিসের গেস্ট হাউসটিও বেশ। ঢুকেই বাথরুমটা দেখে নেওয়া মাস্ট। ঐটিতেই আত্মার সম্পর্ক। পরিষ্কার বাথরুমের পরিবর্তে একবাটি ইলিশ? উহু তুচ্ছ, তবে যদি স্ট্রেইট ফ্রম পদ্মা হয়, তাহলে ওই ইয়ে আর কি। যাহোক বিছানা পরিষ্কার। ঘরে জল? তোয়ালে? সব জায়গামতো অবস্থিত। পারফেক্ট। অফিসে ঢু মারতে হবেই। তাড়াতাড়ি চলে আসতে হবে এদিক-ওদিক ম্যানেজ করে। গিন্নিকে ফ্লাইং কিস দিয়ে বেরিয়ে যাবেন যেই, গিন্নি বলে উঠলেন,"বলছি, টিভির রিমোটটা?" "ধুস, এই তো নাও। চলে আসবো তাড়াতাড়ি বুঝলে?" রসিকবাবু বলে বেরিয়ে গেলেন। এ
র পরের কয়েক ঘন্টা কাটানো যেন জিও সিমের নেটওয়ার্ক খোঁজা। কিছুতেই ঘড়ির কাটা আর নড়ে না। ফাইলের পর ফাইল, শেষ আর হয়না। লঙ্কাহীন মামলেট গেলা এর থেকে সহজ। বিকেল সাড়ে পাঁচটা অব্দি ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ফটোগ্রাফারদের মতো উত পেতে বসে ছিলেন। ঠিক সাড়ে পাঁচটা বাজতেই বেরিয়ে এলেন ঝোপ থেকে। এদিক ওদিক দেখে চুপি চুপি গুটিগুটি পায়ে কোনোরকমে বসের কেবিনটা ক্রস করতেই উনি ভ্লাদিমির লেনিন। তেমনি দর্পে গটগটিয়ে ঘরে ঢুকলেন। গিন্নি কোথায়? বাথরুমে? উহু? তবে? বিছানার ওপরে লেপ মোড়া? বোঝো ..... গিন্নি এসি চালিয়ে, লেপ মুড়িয়ে, জড়িয়ে, ঘুমিয়ে, রসিয়ে, খানিক কষিয়ে, নাক ডাকিয়ে, সুরে সুরে ভনভনিয়ে ওই আর কি  ..... ঘুমোচ্ছেন।
ধ্ধ্যুস বলে বিমর্ষ রসিকবাবু বসতে যাবেন খাটে, অমনি কর্কশ আওয়াজে,"আজ ব্লু হ্যা পানি পানি  ....." বেজে উঠলো। গিন্নির মোবাইলের অ্যালার্ম আর অমনি গিন্নি ধড়মড়িয়ে উঠলেন। রসিকবাবুর চেহারায় হাসি ফুটে উঠলো। যাক।
গিন্নি -"ওমা তুমি এসে গেছো? কখন এলে?"
রসিকবাবু হামাগুড়ি দিয়ে চোখ সরু করে গিন্নির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে-"চাহে কোই মুঝে জংলী কহে  ..... "
গিন্নিও মুচকি হেসে-"কেহেনে দো জি কাহ্তা রাহে  ...."
রসিকবাবু উল্লাসে -"হাম পিয়ার কে তুফানো মে  ....."
অমনি আবার "আজ ব্লু হ্যা পানি পানি  ....." বেজে উঠলো।
রসিকবাবু-" ওহ কি মুশকিল, এটা বন্ধ করতো, থেকে থেকে বাজছে কেনো?"
গিন্নি-"ওহ,এই রে ছটা বাজলো, সরো দেখি সরো। "
রসিকবাবু -,"য়্যা, কি হলো?"
গিন্নি (এক ঠেলা দিয়ে)-"দিদি নম্বর ওয়ান, যাতে মিস না হয় স্নুজ করে রেখেছিলাম মোবাইলের অ্যালার্ম।সরো দেখি সরো। আমি খুব ভাবছিলাম জানো যদি জি বাংলা না আসে এখানে! প্রণাম করে নামজপ করতে করতে ভয়ে ভয়ে টিভি খুলতেই উফফফফ কি শান্তি। বাড়ি ফিরে গোপালকে এক্সট্রা নকুলদানা আর মমমম সরভাজাও দুটো দেব।দেখি সরো"
রসিকবাবু গিন্নির ধাক্কায় ততক্ষনে খাট থেকে নিচে মাটিতে।
রসিকবাবু বিড়বিড় করছেন,"হাম পিয়ার কে তুফানো মে গিরে হ্যা হ্যাম ক্যা করে"





Tuesday, 21 March 2017

জীবন মানেই জিবাংলা

অফিস থেকে ঠিক বেরোনোর মুহূর্তে বুড়ো বস একগাদা ফাইল চাপিয়ে দিয়ে পাঠালেন পিওনের হাত দিয়ে। যারা বলে গভর্নমেন্ট চাকরি সুখের, তাদের বিরিয়ানিতে গাদা গাদা উচ্ছে সিদ্ধ। তাদের রসোগোল্লায় গাদাখানেক নুন। তাদের মটনরোলে সোয়াবিন আর পনির ঠাসা।
"ধ্যাৎ তেরিকা" বলে সব ফাইল ঠেলে বিনীতা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
মিটির এক্সাম কেমন হলো কেজানে। এতক্ষনে নিশ্চয় এক্সাম শেষ। একটা কল করে দেখ যাক। টিংটিং ফোন , রিং হচ্ছে। কিন্তু ওপার থেকে কোনো উত্তর নেই। "উফফফ" বলে আবার ফোন। এবারও কোনো উত্তর নেই। নিশ্বাসটা জোরে জোরে পড়ছে বিনীতার।
সতেরো বছরের মেয়ে, তবু একা ছেড়ে একমুহূর্তে থাকতে পারে না বিনীতা। সমসময় চিন্তায় থাকে। স্বামীর সাথে ডিভোর্স পাঁচ বছর হলো। মা আর মেয়েকে নিয়ে সমস্ত পৃথিবী বিনীতার।
মা কে ফোন করে দেখি তো। এখানেও রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ফোন তোলে না। কি  মুশকিল। টেনশনে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড়। তাড়াতাড়ি ট্যাক্সি ধরে জোরে চালাতে বললো বিনীতা। পুরো রাস্তাটা একবার এই ফোন, আরেকবার ওই ফোন। এরকম তো কোনোদিন হয়না। মাঝরাস্তা যখন পৌঁছেছে, বাইরে অফিস টাইমের ট্রাফিক। জঘন্য। নাঃ মিটির বন্ধু কে ফোন করি। টিংটিং ফোন , রিং হচ্ছে।
-হ্যালো
-হ্যা হ্যালো, আমি মিটির মা বলছি
-হ্যা বলুন বিনীতা। আজকের পেপারটা কি বাজে হয়েছে না। সব আউট অফ সিলেবাস। মিটির কেমন হো  .....
- হ্যা মানে বলছি, মিটিকে ফোনে পাচ্ছি না। ওকে দেখেছেন ছুটির পর?
- য়্যা? মিটি? মমমম হ্যা বেরোলো তো। স্কুলভ্যানেও উঠলো দেখলাম, কিন্তু পেপারটা অতি জঘন  .....

যাক্ তাহলে ভ্যানে উঠেছে। বাড়ি পৌঁছেছে।  ......
কিন্তু তাহলে ফোন ধরছেনা কেন। বাড়িতে পৌঁছলে মা বা মিটি কেউই রিং শুনতে পাচ্ছে না? আর পিলামাসি, সেও তো আছে। সেও কি এখনো রান্না ঘরে? ভ্যানওয়ালা ঠিকঠাক পৌঁছে দিয়েছে তো? নাকি? আবার টেনশনে অস্থির হয়ে উঠলো বিনীতা। আর ভাবতে পারছে না, মাথাটা টলমল করছে। হাতগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছলো। তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকলো। বাড়ির একটা চাবি বিনীতার কাছে থাকে। সব্বাই উপরের ঘরে থাকে। হাঁকুপাঁকু করে উপরে উঠতেই এদিক ওদিক দেখে, কেউ কোথাও নেই। মা র ঘরের দরজা বন্ধ। পড়িমরি ঠেলে ঢুকতেই দেখে প্রচন্ড শব্দে টিভি চলছে।  আর মা, মিটি , পিলামাসি সব বুঁদ হয়ে টিভির দিকে। "টেন পোয়েএএএএএএএএএন্টস, দি  .. দি  .. নম্বর ওয়ান। দি  .. দি  .. নম্বর ওয়ান।"
প্রচন্ড রাগে বিনীতা বলতে শুরু করলো,
"কি ব্যাপার কি হ্যা? তখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি? তোমরা কি পাগল? কোনো কান্ডজ্ঞান নেই নাকি হ্যা? অফিসের সমস্ত টেনশন নিয়ে আছি, তার ওপর ফোনটা ধরারও প্রয়োজন  বোধ  ....."

মা: "কুমড়ো   ....."
মিটি: "না গো দিম্মা, আনসারটা ক্যাডবেরি হবে ...."
পিলামাসি: "না না, কোনো সব্জির নাম বলতি হবে  ....."

সব দেখে ধপ করে বসে পড়লো বিনীতা। বসতে গিয়ে দেখে চেয়ারে ডাই করে রাখা সব জামাকাপড়, তার মধ্যে মা আর মিটির ফোনদুটো চোখ পিটপিট করে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে।

Monday, 6 March 2017

রিকি বললো,"আমার মা শুধু পাপার হাত ধরে থাকে।"

রিকির আজ ক্লাস ফোর হলো। নতুন ক্লাসে শুরুর দিনে সবাইকে নিজের ব্যাপারে চার লাইন বলতে বলা হলো। ছোট্ট ছেলেমেয়েরা নানারকম ভাবে নিজেদের কথা বলছে। এবার পালা রিকির। রিকি বেঞ্চ থেকে উঠে ধীরে ধীরে গেলো সামনে। শুরু করলো।
"আই এম রিকি বোস। মাই ফাদার ইস ধীমান বোস। মাই মাদার ইস শর্মিলা বোস। মাই ফাদার ইস এ পোয়েম   ....."
কেউ কেউ হাসতে শুরু করলো। টিচার বললেন,"রিকি, নট পোয়েম বেবি, ইট উইল বি পোয়েট"
রিকি বললো,"উফফ, সরি টিচার, মাই ফাদার ইস এ পোয়েট। মাই মাদার ইস এ  ......" বলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে রিকি।
টিচার পরিস্থিতি সামাল দিতে বললেন,"ওকে, ভেরি গুড, নেমে এসো রিকি। হু ইস নেক্সট?" সমস্ত ক্লাস যথারীতি ক্লাপ করলো। উঠে পড়লো পরের জন।
রিকি বেঞ্চে ফিরে আসতে পাশে বসা বন্ধু টনি জিজ্ঞেস করলো,"তুই কেনো স্টেমার করছিলি? চুপ করে গেছিলি কেনো হঠাৎ? তোর মা কি করে? ডক্টর? হাউজওয়াইফ?"
রিকি বললো,"আমার মা শুধু পাপার হাত ধরে থাকে।"
টনি হেসে উঠলো,"শুধু পাপার হাত ধরে থাকে? আর কিছু করে না? আর ইউ ম্যাড রিকি?"
রিকি মাথা নিচু করে বিড়বিড় করলো,"সত্যি বলছি"
বাড়ি ফিরে টনি সব কথা মাকে বলছে, আর হাসছে। যত হাসছে, মার মুখ তত গম্ভীর হচ্ছে। শেষে মা বললো,"টনি বেবি, তুমি রিকির থেকে একটু দূরে থাকবে হ্যা? যা বলছি শুনবে কিন্তু। হি ইস ইল"
ইল!!
পরের দিন টনির মা দেখা করলেন রিকির বাবার সাথে, সব বললেন, শেষে বললেন,"আমার মনে হয় ওকে ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো দরকার। মানে বাইরে থেকে তো ও সুস্থ। প্লিজ ডোন্ট টেক মি রং। হয়তো মায়ের অভাবটা ফিল করতে করতেই  ......"
রিকির বাবা টলোমলো পায়ে বাড়িতে ঢুকেই খোঁজ করলেন ছেলের। ছেলে ঘুমোচ্ছে। ঘুম ভাঙ্গা অব্দি অপেক্ষা করতে সোফায় ঠাঁয় বসে ভাবলেন। এ কি ভাবে সম্ভব। সত্যি ছেলে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে?
তখন ছটা হবে, ছেলে পিছন থেকে "পাপা, এসে গেছো" বলে গলা জড়িয়ে ধরলো। বাবা শান্ত ভাবে, রোজের মতো স্কুলের সমস্ত গল্প শুনলেন। কিন্তু ক্লাসের ঘটনাটা এড়িয়ে গেলো রিকি। বাবা জিজ্ঞেস করলেন," রিকি সোনা, তুমি জানো তোমার মা আকাশের ষ্টার, বলেছি না কতবার? তবে তুমি টনিকে আজ ওরকম বললে কেনো?"

রিকি চমকে গেলো, পাপা জানলো কি করে? বিড়বিড় করে চোখ ছলছল রিকি বললো,"মা সবসময় তোমার হাত ধরে থাকে। দাদুকে বলেছিলাম, দাদুও বিলিভ করেনি। আমাকে বকলো, তোমাকে বলতে বারণ করেছিল...তাই তো আমি … এখনো মা তোমার হাত ধরে আছে, তুমি একবার ঘুরে আয়নায় দেখো? পাপা, মা তোমার সাথেও কথা বলে না? কি হলো পাপা, কথা বলো, তুমি কি ভয় পেয়েছো?"

Thursday, 2 March 2017

অমুকবাবু কি বাঙালি?

মিস্টার অমুক। দুর্ভাগ্যক্রমে ওনার জন্ম ভারতবর্ষের বাংলায়। ইংলিশ মিডিয়ামে বড় হতে হতে তিনি দুর্ভাগ্য আরও বেশি অনুভব করেছেন। তার জীবনে এ লেগে আছে কলঙ্কের মত। সে নিয়ে তার লজ্জার শেষ নেই। চাকরিজীবনের আগে এ কলঙ্ক থেকে বাঁচার চেষ্টার ত্রূটি ছিলনা বিন্দুমাত্র। ভাঙা-ব্যাঁকা-ন্যুব্জ-ক্ষীণ ইংলিশ নিদেনপক্ষে হিন্দি ব্যবহার করেছেন প্রতি মুহূর্তে, বাংলায় তার সাবলীলতাকে সচেতনভাবে, খানিক নির্দয়ভাবে অস্বীকার করে। "হাত দিয়ে খেতে তার অসুবিধার" কথা প্রকাশ করেছেন বারে বারে প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতে। বাবা-মার সাথে তাজমহল ঘুরতে গিয়ে প্রথম ধপধপে সাদা চামড়াওয়ালা মানুষ পড়ে তার চোখের সামনে। তার সাথে ছবি তোলার বায়না তার বাবাকে অস্বস্থিতে ফেললেও মা সে সাধ পুরণে আকাশ-বাতাস এক করে দিয়েছিলেন। ছেলেটির অনুরোধে সে ছবি দেখতে হয়েছে, খানিক বাধ্য হয়েই পরিচিত স্বজন-কুজনদের। ছোট্টবেলায় যতটুকু সম্ভব আর কি। চাকরিজীবনে পৌঁছনোর পর প্রথম শর্তই ছিল, চাকরি হতে হবে বাংলার বাইরে। মিলেও গেলো একটি, আইটির ঘাঁটি বেঙ্গালুরুতে। সেখানে গিয়ে যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন, নিজের আদি বাড়ির কথা সর্বসম্মুখে না আনতে। কেউ কখনো তাকে যদি জিজ্ঞেস করতেন,"আর ইউ পাঞ্জাবি" বা "আর ইউ ফ্রম সাউথ", একরাশ খুশি ফুটে উঠতো তার চোখে মুখে। বাংলায় আর প্রায় আসেনি না অমুকবাবু। সমগ্র বাংলা তখন তার কাছে গলে যাওয়া ভাতের মতো। এহেন অমুকবাবু রোজের মতো একদিন বেড়িয়েছেন প্রাতঃভ্রমণে। আগের দিন বার্থডে সেলেব্রেশন জোড়দার হয়েছে। তাই প্রাতঃভ্রমণটা আজ মাস্ট। একপাঁক ঘুরতেই পেট মোচড়, কিছুতেই আর চলতে পারছেন না। বসে পড়লেন কাছাকাছি একটি বেঞ্চে। মাথা ঘুরছে, চোখ অন্ধকার। 
****
চোখ খুলতেই দেখলেন নিজের ঘরে শুয়ে আছেন, আর সামনে একটি মাঝারি সাইজের টাক মাথা লোক দাঁড়িয়ে। লোকটি মুচকি হেসে বলতে শুরু করলেন,"যাক, জ্ঞান ফিরেছে তাহলে, আর একটু দেরি হলেই ডাক্তার ডাকতে হতো।"
অমুকবাবু বলে উঠলেন,"বাঙালি? এই রে … আই মিন আর ইউ বেঙ্গলি? আই ডোন্ট সিম টু নো ইউ, এন্ড হোয়াই দা হেল ডিড ইউ এন্টার হিয়ার উইথাউট মাই পারমি ...... "
লোকটি বলে উঠলেন,"দাঁড়ান দাঁড়ান, উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? পার্কে দেখি বেঞ্চিতে শুয়ে গোঙাচ্ছেন। আমি বুঝলাম, এসিডিটি। যতই হোক বাঙালি তো, গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারি, জেলুসিল কেস না নেক্সট লেভেল।"
অমুকবাবুর মুখে রা টি নেই। 
লোকটি বলে চলেছেন,"একটু চেনা লাগছিলো আপনাকে। গোঙাতে গোঙাতে যেই বললেন, গলা জ্বালা। ব্যাস, একদম স্ট্রেইট ব্রেনে কিক। কোরামঙ্গলাতে তো, দুর্গাপুজোর চাঁদা চাইতে এসেছিলুম না দু-বছর আগে? কে যেন খবর দিলো এই ফ্ল্যাটে বাঙালি আছে। আপনি কি সব ভাষা বলতে শুরু করলেন, সেই থেকে আপনাকে আর ঘাটায়নি, মানে ইয়ে সরি। যাকগে, তারপর ট্যাক্সি ফ্যাক্সি ডেকে এখানে পৌঁছে, বিল্ডিংয়ে উঠলুম। তারপর তো কি জ্বালা। আপনার সাউথইন্ডিয়ান বাড়িওয়ালা চাবি দিতেই চায়না। বলি মশাই দেখতে পাচ্ছেন না, একজনের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তারপর ওই পাতি বাঙালি কায়দায় মালটাকে হাত করলাম। বললাম, আমরা একই শহরের কলকাতার, আইডি কার্ডটা দিয়ে আস্তে হলো শেষে। ভদ্রলোকের যত চিন্তা বাড়ির সেফ্টিতে, মানুষের জীবনটিতে ততটা নয়। আর বলুন কিছু জানার আছে?" 
অমুকবাবু ধাতস্থ হচ্ছেন ধীরে ধীরে। রোবটের মতো হঠাৎ বলতে থাকেন,"আমি কি বলে যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবো, আপনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন" 
লোকটি বলেন,"ও কিছু নয়, আমরা সব ভিনদেশে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। নিজেদের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে হবে অনলি টু সার্ভাইভ। আচ্ছা জ্ঞান দিয়েছি আপনার বাড়িওয়ালাকে। ব্যাটা আমাকে সন্দেহ করছিলো? আচ্ছা ভদ্রলোক কিরকম ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে ছিলেন, যখন জানলেন আপনি বাঙালি.যাক, আপনি রেস্ট নিন। আসুন না মাঝে মাঝে আমাদের আসোসিয়েশনে। জমিয়ে আড্ডা হবে। আসি।”
অমুকবাবুর পেটব্যাথা একদম নেই এখন আর, কিন্তু মাথাটা যেন আবার ঘুরছে, ধন্যবাদ-জ্ঞাপন-জীবন-রক্ষা এই এতগুলো বাংলা শব্দ কি করে তিনি নিজে মুখে বললেন!

Thursday, 23 February 2017

রুদ্রোদয় হোক

আজ সকালে এলাকার প্রত্যেক স্বামী একটা খাম পেয়েছেন পাঞ্জাবি বা শার্ট বা বারমুডার পকেটে। মুশকিল হচ্ছে, যে খামটা খোলা যাচ্ছে না। কাগজের, অথচ টানো, ছেড়ো, উপড়ে ফেলো, অল আন-সাক্সেস্ফুল। খামটা পেয়েই নিজ নিজ পত্নীকে তা বলাতে তারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। শুধু স্বামীরাই দেখতে পাচ্ছে খামটা। নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে যে বাকিদের সাথে বসে এ নিয়ে কথা বলবে, তারও সুযোগ দিচ্ছেনা বৌয়েরা। আজ একটার পর একটা কাজ চাপিয়ে যাচ্ছে। সব থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা হলো, মনে মনে গালাগাল দিলে বৌ বুঝে যাচ্ছে আর উল্টে দশটা বৃহত্তর এবং জোরাল ঝাড়ছে। রাত্রেবেলা স্বামীদের তখন কুকুরের মতো জিভ বেরিয়ে গেছে। এলাকার স্বামীদের মধ্যে জয়ন্তও একজন। রাতের বাসনগুলো মেজে যখন আর শরীর চলছেনা, হঠাৎ ফোন।
-হ্যালো
-আমি রুদ্র, বাড়ির বাইরে চলে আসুন এখুনি, অপেক্ষা করছি।
-আজ না আর পারছিনা বুঝলেন? কে বলুনতো আপনি? ব্যাডমিন্টন ম্যাচের জন্য ফোন করে থাকলে বলে দি, আজ যা গেছে, কাল যদি বেঁচে থাকি, তাহলে ফিল্ডে যাবো, না হলে আপনারা দেখে নিন। রাখছি।
-এখুনি আসবেন, না টেনে বাইরে নিয়ে আসবো?
-আরেব্বাবা থ্রেট দিচ্ছেন নাকি হে? কারোও কাছে কোনো ধার আছে বলে তো জানি না! সুদীপের কাছে একটা বিয়ার ডিউ আছে ব্যাস। আপনি কে বলুনতো? ফোন রাখ   ....... এই অব্দি বলতেই হঠাৎ একটা ঝড়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জয়ন্ত দরজার বাইরে। সৎবিৎ ফিরতেই জয়ন্ত দেখে আশপাশের সব স্বামীরাও দাঁড়িয়ে, সব হতভম্ব। ঠিক তখনই-
-সরি, একটু ফোর্স করতেই হলো, আপনারা থ্রেট আর নির্দেশের তফাৎ জানেন না। তাছাড়া একটু ব্যস্ত, তাই শক্তির ব্যবহার করতেই হলো।
স্বামীরা হতভম্ব, এদিক ওদিক চাইছে। শব্দ আসছে, কিন্তু কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছেনা। অথচ একটি সুপারপাওয়ারের ব্যাপারস্যাপার তো আছেই মনে হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই কণ্ঠ

-আমাকে দেখার ঋদ্ধি তোদের এখনো হয়ে ওঠেনি রে ছোকরার দল। খুব দরকারি যে কটি কথা বলতে এসেছি শোন। আজ তোরা সমস্ত করেছিস, তোদের নিজের কাজের সাথে সাথে যা রোজ স্ত্রীয়েরা করে থাকে তাও। এই ট্রেলারটা যদি রিপিট না হতে দেখতে চাস, তাহলে প্রতি শিবরাত্রিতে যে ড্রাম কে ড্রাম দুধ বইয়ে দেওয়ার তোদের স্ত্রীয়েদের প্ল্যান তা বইয়ে দে পাশের বস্তির শিশুদের মধ্যে, মেয়েদের এক গ্লাস বেশি দিস। আর ওর একফোঁটা দে আমার লিঙ্গে। এই ধরাধামে দুধের বন্যা নালায় না হয়ে হোক রক্ত-মাংসের শরীরে। আর ভাবছিস, একথা একেবারে স্ত্রীয়েদের না বুঝিয়ে তোদের বোঝাচ্ছি কেনো? সেটা তোরা জানিস। চলি।
**
উফফফ সবে সকাল সাড়ে ছয়, ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। বাপরে স্বপ্ন বটে। উফফফ। জয়ন্ত পাশ ফিরে বেশ তরিজুত করে আবার শুতে গিয়ে দেখে মাথার পাশে, সেই খাম। ধড়াস করে উঠলো বুকটা। তাড়াতাড়ি খামটা খোলার চেষ্টা করতেই খুলে গেলো। ভিতর থেকে বেরোলো একটা চিরকুট তাতে লেখা দুলাইন
“জন্ম আমার তাপ থেকে, অগ্নিচ্ছটা থেকে।
তোদের মধ্যে রুদ্রোদয় হোক, একে, একে।“

Sunday, 19 February 2017

আদিম এবং অকৃত্রিম, তথাপি প্রতি পলের আনন্দ

- মানে, আর কতক্ষন? লোকদেখানো না করলেই নয়?
-ওহ, মানে আমি লোকদেখাই, আর তুমি? ধোওয়া তুলসীপাতা
-তাহলে তুমিই দেখো, এই হিসেবে তো আমি রিলিশড ফ্রম অল এলিগ্যাশন্স।
-মানে? কি ভুলভাল বকছো।
-আরে তুমি তো বললে তুলসীপাতা, তুলসী দাসের রামায়ণের পাতা। খুললেই তো একের পর এক গৃহঅশান্তি। সে দিক দিয়ে আমি তো শান্তিপ্রিয় এবং ………
-থামো, সোজা কথাকে শুধু উল্টো করা। তুমি হলে ঘাপটি, ঘাপটি বোঝো? লোকের কাছে সাধুপুরুষটি, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না। আমি চিনি না তোমাকে …… বাব্বা।
-উঁহু উঁহু সাধুরা জেনেরালি নিরামিষাশী, ভাজা মাছ তো আউট অফ কোয়েশ্চেন। আর যে সাধুপুরুষ, মাছ ভাজতে পারে, সে ওল্টাতে পারবেনা কেন হে! তার কি হঠাৎ প্যারালিসিস হলো? কোইন্সিডেন্স অনুযায়ী যদি তা হয়ও, পয়েন্ট ওয়ান পার্সেন্ট, তাহলে তার ভাজা মাছের চিন্তা ছেড়ে এম্বুলেন্সের নম্বর খোঁজা আর হরিনাম জপ করা উচিত। বাংলার প্রবাদ গুলোর একটু রিভিশন দরকার। ইটস হাই টাইম।
-এই লোক আমায় পাগল করে দেবে একদিন। এই লোকের সাথে ঘর করে দেখাক কেউ।
-সে চান্স নেওয়া বোকামোর কাজ হবে মনে করি। আর তাতে লসটা তোমারি।
-আচ্ছা? তাই নাকি?
-মানে, শুধু শুধু খাওয়ার লোক বাড়াবে?
-আচ্ছা, মানে ঝি গিরিও করাতে চাও আমায় দিয়ে, তলে তলে এতো। চলে যাবো যেদিকে দু-চোখ যায়।
-তোমার ক্যাটারাক্ট অপারেশনটা হয়নি যে।
-ওহ বাহ্, হলে রাস্তায় ছেড়ে দিতে বেশ সুবিধে হতো তাই না? শয়তান, তুমি তল-শয়তান।
-মুখোশের তলায় শয়তান হবে কথাটা
-ওরে আমার বাংলার মাস্টারমশাই, তুমি ওই, তুমি ওই, তুমি মুখোশ, তুমি শয়তান, তুমি পাজি ...... উফ আমার বুক ধরফর করছে।
- বুক ধড়ফড় সেন্স করে সেটা সেন্সরি নার্ভাস সিস্টেমে গিয়ে তারপর সেটা বলতে মিনিমাম ৩০-৭০ মিলিসেকেন্ড লাগে। তোমার কি এতটা সময় .......
- ও মা গো
- আচ্ছা আচ্ছা, ডাক্তার ডাকবো, মানে কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
- বলছি, আগে বলো। গোয়ার টিকিটটা কালই কাটবে, বলো ......
- (বিড়বিড় করে) কে বলে, মহিলাদের বুদ্ধি কম?






Monday, 6 February 2017

ছড়াবেন না কিন্তু

-(কাশির শব্দ শুনে) কে ঘরে কে?

-ইয়ে আমি

-আমি কে, কোথা থেকে বলছেন? দেখতে পাচ্ছি না তো, এই মাঝরাতে ভয় দেখানোর চেষ্টা? পলু তুই নাকি?

- না না পলু নয়, কলু বলতে পারেন, আমি ক্যালেন্ডার। মাথাটা পিছনে ঘুরিয়ে দেখুন না, এই তো পরশু আনলেন নিউ মার্কেট থেকে।

-(মাথা ঘুরিয়ে) আঁ মানে ক্যালেন্ডার .... কথা ...... গুলিয়ে যাচ্ছে সব

- উহু ওরকম অবাক হচ্ছেন কেনো, কাল তো দিব্ব্যি চোখ বন্ধ করে কত কথা বললেন, মানে ইলার কথাও তো বললেন, বলতে বলতে কেঁদে উঠলেন

- ওসব তো স্বপ্ন .... দেখলাম ..... মানে হালকা হালকা মনে পড়ছে

-হে হে জীবনটাই তো স্বপ্ন ভাইটু, ওই যে শেক্সপীয়ার বলেছেন,"আওয়ার লিটল লাইফ ইস রাউন্ডেড উইথ এ স্লীপ" আর আমরা হলাম স্বপ্ন।

-বাব্বা, আপনি তো বেশ পড়েছেন টরেছেন

-ওই আমার পাতায় পাতায় সব যা লেখা থাকে, প্রথম দিনই গুলি খেয়ে নি, তারপর তো প্রতি মাসে রিভিশন চলে, যাই হোক যে কথাটা বলতে চাইছি যে, আজ থেকে প্রেমের হপ্তা। খবর কি রাখেন? মানে সরস্বতী পুজোতে যদি যুৎসই কিছু করতে না পেরে থাকেন, তবে এই সুযোগ। আর প্রেমটা এখন অফিসিয়াল, মানে বেশ বাধ্যতামূলক। আমার পাতায় দেখে নিন, সব ফর্দ লেখা, কবে গোলাপ, কবে চকলেট কবে খুক খুক মানে চুমু ..... ওকি ওরকম হা করে কেনো, কিচ্ছু চিন্তা নেই, বাকি রাতটাতে প্ল্যানটা ছকে ফেলুন দেখি। আমি কাল আবার আসবো, আপডেট নিতে। আর সাজেশন চাইলে অলওয়েজ ওয়েলকাম। তাহলে এখন যাই, বলছি বেস্ট অফ লাক, ছড়াবেন না কিন্তু।