Wednesday, 21 February 2018

ককটেল

আমিষ-নিরামিষ একই ফ্রিজের একই ফ্লোরে থাকলে একটু ছোঁয়া তো লাগবেই। তাই না?
আকাশের মা-র তাতে প্রবল সমস্যা। উপায় হিসেবে ভাবা হলো, আলাদা একটি পুঁচকে ফ্রিজ হবে, যাতে থাকবে নিরামিষ। এবং দুটি ফ্রিজ যেন একে ওপরের থেকে অন্ততপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্বে থাকে।
কিন্তু যদি নিরামিষ ফ্রিজের পাশে বসে আমিষ হাঁচি আসে?
যদি নিরামিষের ফ্রিজের ভিতরকার বাটির ওপর লাগিয়ে রাখা ভেজ-আইডেন্টিফিকেশন-নেইলপলিশ- মার্ক আচমকা উঠে যায়?
যদি নিরামিষের ফ্রিজের ওপর কোনো গেস্ট এসে মটন-বিরিয়ানি খাওয়া কব্জিটা রেখে ফেলে?

গত কয়েকমাস ধরে এই সব সম্ভাবনার কথা আকাশের মা কে বোঝাতে, উনি অবশেষে ঠিক করেছেন, একটি ফ্রিজই থাক। ওই নিরামিষের আগের দিন একটু মুছে নিলেই হবে। যতই হোক, আমিষ-নিরামিষ, খাদ্য বই আর কিছু তো নয়।

ঠিক যেমন, যে দেশে কোনো একটি সরকারী ভাষা নেই (“একটি” শব্দটির ওপর জোর দেবেন), তখন একগাদা আশেপাশের ভাষার সাথে একটু ছোঁয়াছুঁয়ি তো হবেই। তাই না?
উত্তরে-দক্ষিণে-পশ্চিমে গিয়ে কি আর বাংলা বলা যাবে? ওখানে "জল খাতা হুঁ" -এর পাঞ্চ মারতেই হবে। অর্থাৎ আমাদের দেশের লোকজনকে একটু ককটেল হতেই হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক আকর্ষণ মাধ্যাকর্ষণ -এর কারণেও পাঞ্চ আজকাল একেবারে প্রায়-আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। অমনি বলবেন, "বাজে কেন বকছেন? দক্ষিণে তো ওরা দিব্বি নিজের ভাষাতেই কথা বলে।" তা বলে। আমেরিকার রাস্তাতেও তাদের একমাথা তেল চুপচুপে চুলে ফুলের মালা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। আপনি কি ধুতি-শাড়ি পড়েন? প্যারিসে গিয়ে পড়বেন?

ব্যাপার হলো, আপনার মন কি চায়? অন্য ভাষাকে করায়ত্ত করাতে দোষ কি? অবশ্যই নিজের ভাষাকে অপমান না করে। যারা অপমান করে, তাদের ওপর আমারও হেভি ইয়ে হয়। খুব লিখেছি, খিল্লি করেছি তাদের নিয়ে একসময়। কিন্তু এখন মনে হয় তাদের বলি,"ভালো হয়ে উঠুন তাড়াতাড়ি"। কারণ "শো অফ" একটা রোগ। ভাষা আরো অনেককিছুর মতোই সেটার শিকার।
তা বাদ দিয়ে অন্য ভাষাতে অনুরাগ দোষের কি। এই দেখুন না আজকাল বাংলা লেখাতে আধুনিক লেখকরা মাঝে মাঝেই ইংরিজি ব্যবহার করেন, তাদের লেখা পড়তে ভালো লাগলেও পড়া বর্জন করবেন? (ডিসক্লেইমার: এই লেখা যা আপনি এখন পড়ছেন, তার সব কিছুই কাল্পনিক আর কেউ কোন মিল পেলে তা নিতান্তই কাকতালীয়)। সাধু থেকে চলিত হয়েছিল একসময়, তা নিয়েও মহাভারত কম হয়নি। চলিত থেকে এখন ককটেলিত হয়ে গেলেও বিচলিত হবেননা। এটাই নিয়ম। Heraclitus বলেছেন change is the only constant। যদি ইংরিজি না পড়তেন, সন্মান না করতেন, এই কোট টাও  জানা হতো না।

আজ সারাদিন শুদ্ধ বাংলা বলে যেতে হবে নাকি! সে তো আবার ওই "শো অফ" বা ওই সিনেমা হলে "ও বাবা আবার উঠে দাঁড়াতে হবে" টাইপ জাস্ট একটা দায়।
মাতৃ ভাষাটাকে দায় করে তুলবেন না।
আমি বলি কি, অন্য ভাষা কথাতে-লেখাতে পাঞ্চ হচ্ছে হোক। আপনি যেটা চান, সেটাই করুন। চয়েস আপনার। তবে মানুষকে-কুকুরকে-ভিখিরিকে-অন্ধকে যেমন অপমান করা ঠিক না, তেমনি ভাষাকেও না। নিজের ভাষাকে তো একেবারেই না।

মন দিয়ে বাংলাকে ভালোবাসছে দেখুন ওই লোকটা। রাশিয়ার পাতাল রেলে বসে অফিস ফেরত লোকটা জয় গোস্বামী পড়ছেন। 
জয় বাংলা।

জয় বাঙালি।

Friday, 16 February 2018

ট্যাটু

- দ্যাখা দ্যাখা ওটা কি ..... ওটা কি দ্যাখা
- উফফ মা ছাড়ো তো , আমি জাস্ট বাড়ি ঢুকলাম আর তুমি শুরু হয়ে গেলে।
- ঋক, দ্যাখ আমার দিকে। কেন হাত লুকোচ্ছিস! দ্যাখা হাতটা দ্যাখা।
- উফফ মা 
- একি এটা কি? এটা কি করেছিস?
- ও কিছু না। ট্যাটু। বাবাকে বলবে না কিন্তু। বলো বলবে না। প্রমিস করো।
- ট্যা?
- টু।
- মানে? ওই যেগুলো একদম সুঁচ বিঁধিয়ে  .....
- উফফ আরে এ সব কুল মা  ..... তুমি বুঝবে না  ..... আরে কি হলো? মারছো কেন? থামো থামো বলছি। উফফ মা কাম অন  ..... আরে আবার কাঁদছো কেন? আরে তুমি যে কি করো না।

********
- কে কে ওখানে? মা তুমি? কি হলো?
- লেগেছে বাবা তোর?
- আরে না না। তোমার ওই নরম হাতে লাগে নাকি। তোমারই হাতে লেগেছে দ্যাখো। আমার বাইসেপ্সে কি স্ট্রেন্থ জানো? হে হে।
- ধুস। আমি বলছি ওই যে হাতে সুঁচ ফোটালো  .... তাতে লাগেনি?
- ওহ একটু। মাইনর। তুমি আবার কাঁদছো নাকি! উফফ মা  .....
********
- এই যে এদিকে আসুন আসুন এদিকে।
- এই এরা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে গো? ঋক কোথায়? বলো না আমরা এখানে এসেছি কেন? ইসস কি গন্ধ।
- দেখুন। বডির অবস্থা খুব খারাপ। মুখ দেখে ভয় পাবেন না। বাসটা মুখের ওপরেই  ..... মানে যাই হোক দেখুন যদি শার্ট-প্যান্ট বা বডির অন্য কোনো আইডেন্টিফিকেশন দেখে বলতে পারেন, ঋক বসু ইনি কিনা  ..... ওকি ওকি হাতটা ধরে এরকম  ..... ট্যাটুটা কি আইডেন্টিফাই করতে পারছেন? ওকি এই ওনাকে ধরুন ধরুন  ..... উনি বোধহয় ফেইন্ট হয়ে যাচ্ছেন   ..... বলছি মিস্টার বসু, সরি মানে আমাদের ডিউটি, প্লিস বলুন আপনার ওয়াইফ কি কিছু আইডেন্টিফাই করতে পারলেন? ইনি কি ঋক বসু?


Thursday, 8 February 2018

পদ্মাবত এবং টিয়া

পদ্মাবত নিয়ে এ যাবত অনেক ঘোল-শরবত হলো। ওসব নিয়ে না চাইলেও চোখের সামনে, কানের পাশে, হাতের ডগায়, মাথার আগায় যা সব চলছে, তাতে খুব চিন্তিত। না, চিন্তা দেশ নিয়ে নয়, দীপিকার মাথা নিয়েও নয়, বনশালির কুশপুতুল নিয়ে তো নয়ই। চিন্তা ওই টিয়াটিকে নিয়ে।
এ? টিয়া কোথা থেকে এলো!
সিনেমাটি না দেখে থাকলে, নিদেনপক্ষে রানী পদ্মিনীর গল্পটা না পড়ে থাকলে, নিশ্চয় ভূরু কুঁচকে এটাই ভাবছেন।
তা কেসটা এরকম।
বেশি সুন্দরী মেয়ে মানেই মেয়ের বাবারা বাই ডিফল্ট অমরেশ পুরি। এ দেশে অবশ্য তা ছাড়া উপায়ই বা কি! যাক সে অন্য প্রসঙ্গ।
তা পদ্মিনীও সুন্দরী। (সে তো দিপিকা পাডুকোনকে নাম ভূমিকা নায়িকা হিসেবে দেখেই আন্দাজ করেছেন) তাই পদ্মিনীর বাবারও মেয়েকে সামলানোর প্রবল চাপ। কারোর সাথে কথা বলা বারণ পদ্মিনীর। এখানেই এন্ট্রি টিয়ার। হ্যা পাখি। যে সে পাখি নয়, কথা বলা পাখি। তা তার সাথেই জমে ওঠে পদ্মিনীর, সরল বন্ধুত্ব। টিয়াটির বেশ চকচকে নামও দেওয়া হয়, হীরামন। এই বন্ধুত্বর চাকচিক্য দেখে, মেয়ের বাবার আবার চাপ। বোধহয় এই জন্য যে পাখিটি ছেলে। ছেলে পাখির সাথেও কথা বলা যথেষ্ট রিস্কি মনে করাতে পাখি-হত্যার হুকুম জারি হলো। ব্যাস, টিয়া অমনি জান বাঁচিয়ে ভাগ মিলখা। এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে হাত বদল হয়ে সে এবার রতন সিংহের পোষ্য।
গল্প এতদূর শুনলে, বেচারা টিয়া আর পদ্মিনীর বিচ্ছেদের দুঃখে মনটা কিরকম কিরকম ভারী হয়ে আসে শ্রোতার। হওয়ারই কথা।
তা টিয়ার হঠাৎ খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, পদ্মিনীর রূপ নিয়ে গল্প করতে থাকে রতনের কাছে। ব্যাস রতনেরও, দিল মে লাড্ডু ফুটা। আরে বাবা, ছেলেদের হৃদয় হলো সেই ভালোবাসার তেঁতুল পাতা, সুজন-নজন আরও কতজনই আসুক না কেন, ঠিক ফিট হয়ে যায়। রতনেরও তাই। বাড়িতে অলরেডি বৌ বর্তমান, তবু লাড্ডু ফুটা তো ফুটা। এইসময় বলি টিয়ার আক্কেলটাই বা কি হ্যা? নিজে পাখি হয়ে ঝাড়ি মারলি, তার থেকে বেশি কিছু হবে না জেনে আরেকজনকে লেলিয়ে দিলি! পদ্মিনীর বাবার পাখিকেও সন্দেহ করা যে একেবারেই যুক্তিসঙ্গত, তা আর বলতে বাকি রাখে না।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, মেয়ের বাবারা যদি এ লেখা পড়ছেন, একদম নোট করে নিন। কাউকে বিশ্বাস করা নয়। বাড়িতে কাক-চিল-এমনকি ভোডাফোনের কুকুরও যেন বসতে না পারে।
যাই হোক, সে টিয়াটি এমন ইয়ে, যে সে রতন সিংকে পদ্মিনীর ঠিকানা জানায়, উড়ে গিয়ে পদ্মিনীকে দেখা করার ডেট-টাইম অ্যাডভান্স জানিয়ে দেয়, মানে জিপিএস-হোয়াটস্যাপ এর কম্বো, ওই একাই হীরামন টিয়াটি। এরপর তো মহাকান্ড। সাত সমুদ্র পার করে রতন পৌঁছয়, হেব্বি ঝামেলা ঝঞ্ঝাট সামলে রতন-পদ্মর বিয়ে হয়, তাতেই কি শেষ? সাথে জীবন-যুদ্ধ সামলানো, সতীনের সাথে হাল্কা কূটকচালি ম্যানেজ করা ওসবও হয়। কিন্তু ও নিয়ে আমার গল্প নয়। কারণ ওতে টিয়া নেই। শুরুতেই বলেছি চিন্তা আমার টিয়া নিয়ে।
সুফি কবি জয়সির লেখা অনুযায়ী, ওই টিয়াই নাকি কি এক কারণে রতন -এর থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং আরও একবার খুজলি করে, এবার একেবারে স্বয়ং আলাউদ্দিন খিলজীকে। আর তারপর তো খেল খতম, আর পয়সাও হজম হয়না। এই পোরশনটা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। মানে টিয়াটির চাপা-শয়তানি ঠিক কতদূর তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আর এখানেই আমার চিন্তা।
প্রশ্ন হলো, চাপ তো এখনো আছে। টিয়াটি কোথায়? সে তো এখনো ফ্রি বার্ড। আরে বাবা, জানি জানি বলবেন এতো বছর হয়েছে, তো থোড়ি সে পাখি আছে নাকি। আরে বাবা, জন্মান্তর বলেও তো কথা আছে, তাই না? আর তাছাড়া তার যে বংশবৃদ্ধি হয়নি, তাই বা কে বলতে পারে। প্রেমে ভাংচি দেওয়া ইয়েরা ওই ওরই বংশধর যে নয়, তা কে বলতে পারে।
তাই আর কি, একটু চাপে। এরা আশেপাশেই ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। দেখছেনই এই এতবছর পরেও রতন-পদ্ম-খিলজী যা চাপে, তাতে আপনাদের কে বাঁচাবে।
তাই সবাই সাধু সাবধান।

Wednesday, 6 December 2017

লিস্টটা

বাপ মরা মেয়ে তাও আবার বয়স পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই। সে মেয়ের বিয়েটা ঠিকঠাক দিতে পেরে উমাজেঠিমা বেশ খুশি। আরও বেশি খুশি এইজন্য যে বিয়ের ১ মাসের মধ্যে মেয়ে তল্পি-তল্পা নিয়ে বাড়ি ফেরেনি। ঘন ঘন ফোন করেনি। যে কবার ফোন করেছে, শশুড়বাড়ির গুষ্টি উদ্ধার করেনি। আর  এতো কিছু করেনি বলেই, উমাজেঠিমা দারুন খুশি।
একদিন সকালে ছেলেকে ডাকলেন ঘরে।
- শোন বাবু, পিলুর বিয়েটা ভালোই হলো কি বল? শোন, একটা লিস্ট করেছি। তার মধ্যে টুকটাক জিনিসগুলো স্বপনকে দিয়ে আনিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু কিছু জিনিস আনতে হবে তোকে। কাল বিকেলের আগে একটু এনে দিস তো।
- সে এনে দেওয়া যাবে মা। দেখি কি জিনিস? লিস্টটা দাও  ..... ও এই টিক দেওয়া গুলো? আচ্ছা। য়্যা? মানে? হুঁকো? গাঁজা? মানে? মা?
- হ্যা আর ওই ইসে ....
- কি?
- ওই মদের মধ্যে কোনটা ভালো হবে রে?
- মানে? তুমি? মদ? গাঁজা? কিসব বলছো?
- কেন?
- মানে তুমি বলছো? তোমার চাই মদ?
- কেন? তুই আকাশ থেকে পড়ছিস যে? কি বলছি যেন বুঝতেই পারছিস না? রোজ রবিবার দরজা বন্ধ করে কি গেলা হয়, জানিনা নাকি?
- এ এই ইয়ে মানে  ..... না মানে আহা আবার আমার কথা কেন  .... আমি বলছি যে তুমি? মদ? মানে  ....
- মানে মানে করিস না তো। কোনটা ভালো হবে বল।
- ওই ওই ইয়ে, হুইস্কি।
- আচ্ছা আনিস ঐটাই। ব্যাস বিকেলের মধ্যেই আনিস কিন্তু। রাতেই বসতে হবে তো?
- (চিৎকার করে) মা গো, বলছি এমন কি হলো গো তোমার? এই রকম করছো। আমাদের কোনো ভুল হলে বলো একবার। কি হয়েছে তোমার?
- আরে, কি আবার হবে? "শিবঠাকুরের মানত" এর এবার রিটার্ন টাইম। শিবঠাকুরের পুজো হবে কাল। ওনার যা পছন্দ দিতে হবে না পুজোর সামগ্রীতে?

Monday, 20 November 2017

তুম তানা নানা

পরিস্থিতি হেবি থমথমে। জেঠুর মুখে কালি লেপে শ্রাবন্তীদি নাকি পালিয়েছে। কালি মুছতে সারা পাড়া উইথ পাড়ার ডাক্তার বাড়িতে হাজির। আমি আর দাদা স্কুল থেকে ফিরে খবর পেয়েই দৌড়ে কালি মোছা দেখতে গেলাম। কালি কোথায়! জেঠুর দিব্বি সেই ফর্সাটি। শুধু খাটে হেলান দেওয়া আর বুকে হাত। পাড়ার ডাক্তার বলছেন,"কালই ইসিজি করিয়ে নিন। কোনো নেশা নেই তো? এখনকার ব্যাথাটা আপনার স্ট্রেস থেকেই। বেশি চাপ নেবেন না" চারিদিকে সবার মুখ কালাপানির কয়েদিদের মতো। নিস্তব্ধতার কম্পেটিশন -এ পাড়ার দিদা-দাদুরা মাঝে মাঝে বাঁধ সাধলেও, মোটের ওপর একটা থমথমে ভাব ইন্ট্যাক্ট রাখতে সক্ষম হচ্ছেন সবাই। মাঝে মাঝে চপাট চপাট মশা মারার আওয়াজ। শ্রাবন্তীদির পালানো তবু সহ্য হবে,  কিন্তু ভয়ানক ডেঙ্গি? সে থেকে কে বাঁচাবে? কুঁইকুঁই করে জেঠু বলে উঠলেন,"কাছুয়া টা জ্বালাও না"
উপস্থিত সকলেই ঝটপট শশব্যস্ত হয়ে কাছুয়া খুঁজতে লাগলেন। পেলেনও। মুশকিল হলো, দেশলাই? নাই। জেঠিমার মুখ-এর পরিস্থিতি যা, তাতে বিনা দেশলাই-তেই আগুন লাগার সম্ভাবনা। তাই জেঠিমাকে কেউ ঘাটাতে চায় না। ঠিক এ অবস্থায়, দাদা বলে উঠল,"আরে দাদু, লাইটার তো তোমার পকেটেই"।

সবার মুখ এখন দাদার দিকে। ঠিক তখনি, কার মোবাইলে বেজে উঠলো,"আগুন লেগেছে লেগেছে লেগেছে আগুন তুম তানা নানা নানা"

Monday, 13 November 2017

চিরকুট চিৎপাত

ছাতাটা হারিয়েছি।
কোথায় রেখেছি মনে রাখতে না পারাকেই হারানো বলে, তাই না?
ছাতাটা হারিয়েছি এই ধরুন ছটা বর্ষা আগে। এ ক বছরে অবশ্য ছাতা হারিয়েছি এই স্মৃতিটাই হারিয়ে গেছিলো। মনে পড়লো এই একটা অদ্ভুত ঘটনাটাতে। গত ২৩ দিন ধরে ইতিহাস বইয়ের পাতায় রাখা একটি চিরকুট পাচ্ছি রোজ। তাতে লেখা,"আমি আছি, ইতি ছাতা"। প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে ছাতার মাথা বলে উড়িয়ে দিলাম। কিন্তু  ইতিহাস পড়া ইগনোর করাতে ওই সেদিন স্যারের কাছে প্রবল বকা খাই। বকা খেয়ে ইতিহাস বইটি খুলতেই আবার ওই চিরকুট। মাথাতে আগুন জ্বলে উঠলো। সমাধান এবার করতেই হচ্ছে। মা-বাবা-দিদি কে বলতে গেলাম। হিতে বিপরীত। বুঝলাম, সবার ওই ছবর্ষা আগের স্মৃতিটিকে উস্কে দিয়েছি। চিরকুটের উপস্থিতির থেকে ছাতাটির অনুপস্থিতিতে তাঁরা বেশি মর্মাহত। ফলস্বরূপ ছ-বছর আগে ছাতা হারানোর দিনটির যেন পুনরাবৃতি ঘটলো। সাথে বোনাস প্রাপ্তি- বাবার গুরুগম্ভীর জ্ঞান, ডালের হাতা হাতে মার হাই পিচ উপদেশ আর দিদির? খিল্লিমাখা হাসি। বিশেষ সুবিধা হলো না। সব আশা নিয়ে স্কুলে আমার আমার ডিটেক্টিভ বেস্ট ফ্রেন্ডকে এই ব্যাপারে বললাম। শুরুতেই ওর কথা কেন যে মাথায় আসেনি! যাই হোক, প্রথমেই শুরু করলাম সবকটা চিরকুট নিয়ে প্যাটার্ন বোঝা। উদ্ধার হলো দুটো জিনিস:
১. লেখাটা কারো একার নয়। ডিফারেন্ট হ্যান্ডরাইটিং
২. লেখা কালোকালি তে, কিন্তু শেড এক নয়

এর মধ্যে একটা চিরকুট নিয়ে বন্ধুটি বেশ সিরিয়াস। বললো,"চল বাড়িতে"। গেলাম। পরিস্কার চকচকে ম্যাগ্নিফায়িং গ্লাস নিয়ে এলো ওর দাদার ঘর থেকে। ওই চিরকুটের ওপর কিছুক্ষন ধরতেই চিৎকার করে উঠলো,"তোর দিদি থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট লেখে, তাই না? ওরই কাজ মনে হচ্ছে রে। দেখ না চিরকুটের ওপর আবছা লেখা, ভূতের গপ্পো ৩। আমার মনে হয় এই চিরকুটটা যে পাতাতে লেখা তার আগের পাতাতেই এই গল্পের প্লটটা লেখা শুরু হয়েছিল। ডটপেনে চেপে লেখে বোধহয়, তাই ছাপ পড়েছে নিচের পাতায়। ভেবেছিলো, তুই এই চিরকুট দেখে ভয় পাবি, তাই তোর সাথে একটা রিয়েল এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলো।"
"জিও কাকা" বলে লাফিয়ে উঠলাম। ঠিকই তো, বাড়ির লোক ছাড়া রোজ রোজ আমার ঘরে ঢুকে এ কাজ কে করবে! আজ বাড়ি গিয়ে একটা দুর্দান্ত ক্লাইম্যাক্স মোমেন্ট যে ক্রিয়েট করবো, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। উফফ ভেবেই রোমাঞ্চ জাগছে। মনে হচ্ছে এবার আমার ছাতা হারানোর দোষটা কাটবে।


খুশিতে ডগমগ আমি যখন বন্ধুটির সাথে সমাধান উদযাপন করছি, ওর দাদা পাশের ঘর থেকে ঢুকে বলে," তোপসে, আমার ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা  .... ও তোর হাতে। তোদের কাজ হয়ে গেলে দিয়ে যাস। আর শোন, বাড়িতে সন্দেশ আছে। চাই তো এখুনি ভিতরে যা দৌড়ে।" এই বোনাস সন্দেশ জিভের চারিধারে ঘুরঘুর করতে করতে বললো, মনে হয় দিদি এরকম কাজ বার বার করুক। ২১ রজনী সেনের এই বাড়ি আমার এই জন্য এতো ফেভারিট।

নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি

মেজোমামার বিয়েতে তার সঙ্গে প্রথম দেখা। না ঠিক দেখা নয়। আড়চোখে পলক ফেলে ফেলে নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি কে একটু বুঝে নেওয়া। কালো ধুতির চল সে সময় ছিল না। তাই সবার চোখই ছিল তার ওপর। নানারকম চাহুনি, যেমন “কি বোকা বোকা” “একি অদ্ভুত” “বাহ্ বেশ হাটকে তো” ছিল বটে। কিন্তু তাতে তাকে মোটেই অপ্রতিভ মনে হচ্ছিল না। বরং যেন একটু বেশিই স্বচ্ছন্দ। আর তাতে আড়চোখ আরও বেশি করে তাকেই খুঁজতে লাগলো। তার চোখ দু-একবার আমার চোখকে অ্যাকনোলেজ করেছিল বটে তবে খুব দ্রুত। ইতিমধ্যে এই পুরো সাইলেন্ট টেলিফিল্মটা কখন যে আমার ভাই ট্র্যাক করতে শুরু করেছে জানি না। মালা–‌বদলের ভিড়ে আমার কানের কাছে এসে বললো, “লাভ নেই। এনগেজড। আমাদেরই কোচিংয়ের মেয়ের সঙ্গে” । ড্যাম। চুরি করে ধরা পরে যাওয়া, তাও আবার সে চোরাই মাল যদি অকেজো হয়। ফিলিংসটা ঠিক কেমন হয় বলুন তো! যাক চোখাচুখি নিয়ন্ত্রিত হল তখুনি। সোনু নিগম হয়ে বিড়বিড় করলাম, জানা নাহি থা পিয়ার কি গলি মে।
===============
প্রায় ৭-৮ মাস পরে, অক্সিজেনে তখন পুজো পুজো গন্ধ। নতুন জামার মসমস, নতুন জুতোর ফোস্কা, পুরনো বন্ধুর হইচই, পুরনো রেস্টুরেন্টে নতুন মেনু, সব চলছিল নিজের তালে। উলটোদিকের টেবিলে আমাদের মতোই আরেক দল, একইরকম হুল্লোড়ে মত্ত। শুধু মুখগুলোই অচেনা ….. উহু একটা মুখ তো বেশ চেনা। আরিব্বাস। নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতি যে। আজ সাদা শার্ট নীল ডেনিম। আর সঙ্গে সঙ্গেই মাথা বলে উঠলো, “না না, আর ও পথে না”। ব্যাস সোনু নিগম হয়ে বিড়বিড় করলাম, জানা নাহি থা পিয়ার কি গলি মে। কিন্তু ওপার থেকে ফোর জি নেটওয়ার্কের মতো শক্তিশালী চোখ যেন আমাকে ফলো করছে মনে হল। ইগনোর করতে, আরও বেশি করে মন দিলাম বিরিয়ানিতে। সবে দু-চামচ মুখে দিয়ে বিরিয়ানিতে মেডিটেশন শুরু করেছি, ওমনি “হাই, ডু উই নো ইচ আদার ….. ” সাদা শার্ট নীল ডেনিম আর তার দলবল, চোখের সামনে। কতক্ষণ হা করে ছিলাম মনে নেই। বাকি কী বলে গেল, মনে নেই। আলাপচারিতার শুরু। সুতপা কনুই-এর গুঁতো মেরে বলেছিল,”এই সেই? খবরদার। এনগেজেড কিন্তু।” এরকম সাবধান বাণী শুনে মনে হল, যেন ও সাবধান না করলে আমি যে কোনও মুহূর্তে সাদা শার্ট নীল ডেনিমকে জড়িয়ে ধরবো। আশ্চর্য্য। তা সেই সাবধানবাণীর ঠেলায় বা বিরিয়ানি কন্সেন্ট্রেশনে বাঁধা পড়ায়, আলাপচারিতাতে কন্সেন্ট্রেট করতে পারিনি। আমি মূলত শ্রোতাই হলাম। শেষে অবাক করে দিয়ে সুতপা হঠাৎ নবমীতে ম্যাডক্স স্কোয়ারের প্ল্যান বানিয়ে বসলো। সুতপাকে বুঝতে পারে কার সাধ্যি! আবার দেখা হওয়ার এক্সাইটমেন্ট যে আমার মধ্যে একেবারেই ছিল না তা বলা ভুল। মাস্কারা লাগালাম একটু ঘন করেই। না না, আর কিছু না। একটা প্রেজেনটেব্‌ল লুক তো দরকার, নাকি! তবে সুতপা-বুবাই দের সঙ্গে বেরোলে কেন এ কথা মনে হয় না! ওরা ছোট্টবেলার বন্ধু বলে! ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডা তখন চরমে, সাদা শার্ট নীল ডেনিম আমার কানে ফিসফিস করে বললো, “হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে। কাল একবার লেকে মিট করা যায়? সেই বিয়ে বাড়ি থেকে ট্রাই করছি। না বললে শুনবো না কিন্তু।” হার্টবিট ১১০। আচ্ছা এমন বুক চিনচিন করে কেন বলুন তো যখন মাথা আর মন ঝগড়া করে? মাথার শত অ্যালার্টকে মিথ্যে করে, দেখি না কী বলতে চায়, শুনতে মন চলল দশমীর বিকেলে, লেকের ধারে। পৌঁছনোর দু-কিলোমিটার আগেই এসএমএস, “নাহ সামনাসামনি বলার সাহস নেই। অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে। ক্যান ইউ হোল্ড মাই হ্যান্ড? ফর লাইফ?” মোবাইল থেকে চোখ তুলে মনে হল আশেপাশের কিছু লোক হা করে দেখছে আমায়? খেয়াল করলাম আমার মুখটা এক গাল হাসিতে ভরে গেছে কখন, আমার অজান্তেই! অক্সিজেনে এখন নীল পাঞ্জাবি কালো ধুতির গন্ধ। আশেপাশে লুকিয়ে আমায় দেখছে না তো? বাড়ি ফিরে ভাইকে একটা কিল মারবো ভাবছি।